আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের চালানো কথিত “ফলস-ফ্ল্যাগ অপারেশন” বা ভুয়া পতাকার অভিযানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে মিশরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক “অংশীদার” হিসেবে অভিহিত করেছে তেহরানি নেতৃত্ব। উত্তর মিশরের একটি বন্দর শহরের উপকূলে দুটি জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা কায়রো নিশ্চিত করার পরপরই এই মন্তব্য আসে।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, “মিশর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ও অংশীদার এবং এর নিরাপত্তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
তেহরানের শীর্ষ এই কূটনীতিক আরও যোগ করেন, “আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট করার জন্য পরিকল্পিত ইসরায়েলি চক্রান্ত এবং ফলস-ফ্ল্যাগ অপারেশনগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।”
আরাগচি বলেন, “এই হুমকি স্পষ্ট, অভিন্ন এবং মুসলিম সংহতির প্রতি ভীতিপ্রসূত।”
মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর শহর দামিয়েতার উপকূলে দুটি জাহাজে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ আগুন “একটি ড্রোনের কারণে হয়েছে”—কায়রো এই ঘোষণা দেওয়ার ঠিক পরেই ইরানি কর্মকর্তার এই মন্তব্য সামনে এল।
কায়রো সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, “ঘটনাটির পেছনের পরিস্থিতি উদঘাটন করতে এবং মিশরের স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে” তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে “এখনও পর্যন্ত কোনো পক্ষই এই ঘটনার দায় স্বীকার করেনি।”
ড্রোন হামলার এই ঘটনার পর মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাথে ফোনালাপে জানান যে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত “একটি মারাত্মক উত্তেজনার মুখোমুখি হচ্ছে”। তাঁর মুখপাত্র এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এই উত্তেজনা বন্ধ করতে “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একসাথে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা”র ওপর জোর দিয়েছেন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট।
এদিকে আরব লীগের মহাসচিব নাবিল ফাহমি বৃহস্পতিবার “দামিয়েতা বন্দরে দুটি জাহাজে হওয়া হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন”। তিনি একে “একটি অগ্রহণযোগ্য আগ্রাসন” বলে অভিহিত করেন এবং সতর্ক করে বলেন, “চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের পরিধি বাড়ানোর জন্য কিছু পক্ষ বেপরোয়া ও কাপুরুষোচিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যা ঘটাতে পারে, তার পরিণতির ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।”
ফাহমি তার বিবৃতিতে আরও যোগ করেন, “আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হামলা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত।”
এর একদিন আগে, অর্থাৎ বুধবার আরব লীগের প্রধান সৌদি আরবের পূর্বা প্রদেশে “তেল স্থাপনাগুলোতে বারবার হামলা” এবং “জর্ডান হাশেমী রাজত্বে ড্রোন হামলার” তীব্র সমালোচনা করেন। একে তিনি “একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, যা “অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে।”
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ পরিসরে বিমান অভিযান শুরু করে, যা টানা ছয় সপ্তাহের সংঘাতে দেশটির হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
এর জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে—বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে—হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই হামলাগুলোতে অঞ্চলের কথিত মার্কিন সম্পদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি ইসরায়েলের ওপরও প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালানো হয়।
ইরানের এই প্রতিক্রিয়ায় তেহরান-সমর্থিত ‘অক্ষ শক্তি’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স)-এর সাথে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও অংশ নেয় এবং বেশ কয়েকটি দল এই অঞ্চলে হামলার দায় স্বীকার করে।
এরপর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তান মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, যার ফলে কূটনৈতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরির জন্য শত্রুতার অবসান ঘটে। জুনের মাঝামা সময়ে উভয় দেশ ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (মেমোর্যান্ডুম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে সব মোর্চায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
তবে এই চুক্তি সত্ত্বেও গত ৮ জুলাই থেকে দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে উত্তেজনা নতুন করে শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় এক ডজন দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে এবং তেহরানও এই অঞ্চলের প্রধানত বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতে অবস্থিত কথিত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে।
Source : Rudaw


