সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব, ইয়েমেনের সরকারের সাথে হুথি মিলিশিয়াদের ব্যাপক যুদ্ধ সংঘর্ষ চলছে। হুথিরা সৌদি আরবের আকাশপথে হামলা চালিয়েছিল ও এর জবাবে ইয়েমেনের সরকার হুথিদেরকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। এর মধ্যে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট ড: রাশাদ আলিমী ইয়েমেনকে হুথি শাসন থেকে মুক্ত করতে অপারেশন ফজর ইয়েমেন শুরু করে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে এপর্যন্ত ইয়েমেনের ঘটনাবলী দেওয়া হলো।
২৫–২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আলিমী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন যেখানে জনগণকে ইয়েমেনের সরকারের অনুগত সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান করতে বলেন। তা’ইজের বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের সাথে হুথি বিরোধী বাহিনীর আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ হয়।
২৯ সেপ্টেম্বর–০১ অক্টোবর : তা’ইজের আল ওয়াজিয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে তীব্র সংঘর্ষ হয়। তা’ইজের সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোকে হুথি মিলিশিয়ারা ঘিরে ফেলে ও ব্যাপক হামলা আক্রমণ চালিয়েছিল।
০১ অক্টোবরে হুথি মিলিশিয়ারা পার্শ্ববর্তী দেশ সৌদি আরবের পবিত্র মদীনা শহরের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মিসাইল নিক্ষেপ করে। যদিও হুথিপন্থী মিডিয়াগুলো এটা অস্বীকার করেছিল।
০২–০৩ অক্টোবর ২০২৬ : ০২ ও ০৩ অক্টোবর তা’ইজে বড় ধরনের যুদ্ধ চলছিল। হুথিরা তা’ইজ সিটিতে ব্যাপক হামলা আক্রমণ চালায়। ইয়েমেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জরুরি বাহিনীর (Emergency Forces) চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ সালেম আবদুল্লাহ আল-খাওলানি হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে আল-কাদাহা (Al-Kadaha) ফ্রন্টে নিহত হন। ওই সময়কার সামরিক উত্তেজনা শুরুর পর সরকারি পক্ষের ঘোষিত নিহতদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ পদমর্যাদার নিরাপত্তা কর্মকর্তা।সরকারি সামরিক সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, মাকবানাহ (Maqbanah), জাবাল হাবাশি (Jabal Habashi), আল-মিসরাখ (Al-Misrakh) এবং আল-কাদাহা এলাকায় সংঘর্ষ চলছিল। সরকারি বাহিনী হুথিদের আক্রমণ প্রতিহত করার পাশাপাশি তাদের অবস্থানে বিমান হামলার খবরও জানায়।আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ০৩ অক্টোবর তা’ইজের সামা (Samaa) ফ্রন্টের পাহাড়ি এলাকায় হুথিরা অগ্রগতি অর্জন করে এবং সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। পরে সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবা জানায়, সরকারি বাহিনী ও স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধারা প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর সামা দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নেয়। হুথিদের হতাহত হওয়ার দাবিও করা হয়, যদিও সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
৩ অক্টোবর সরকারি সেনাবাহিনী দাবি করেছিল, আগের ২৪ ঘণ্টায় হুথিদের বিরুদ্ধে ২৫৭টি লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযান চালিয়ে অন্তত ৭০০ হুথি যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে।
০৪ অক্টোবর ২০২৬: ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (PLC) চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো পুনর্দখলের জন্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান ঘোষণার কথা জানান যার নাম দেওয়া হয় অপারেশন ফজর ইয়েমেন । তাঁর ঘোষণায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার ও হুথিদের নিয়ন্ত্রণের অবসান ছিল প্রধান লক্ষ্য। এসময় তিনি হুথি মিলিশিয়াতে থাকা লোকজনদের আত্মসমর্পণ এর আহবান জানিয়েছেন।
একই দিনে হুথিরা সৌদি আরবের রিয়াদ ও খুরাইস এলাকার আরামকো-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করে। হুথিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।
০৫ অক্টোবর ২০২৬– অপারেশন ফজর ইয়েমেন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সরকারি বাহিনী জানায়, তারা লোহিত সাগরের উপকূলে মোখা (Mocha) ও ধুবাব (Dhubab) এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হয়েছে। এ অগ্রগতি সত্য হলে তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রণালিটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার কৌশলগত নৌপথ। মারিব প্রদেশেও রাঘওয়ান ফ্রন্টে হুথিদের অবস্থানের ওপর আক্রমণ এবং মাউন্ট হেলানের আশপাশে হামলার খবর আসে।
০৬ অক্টোবর ২০২৬–উপকূলীয় ফ্রন্টের পাশাপাশি তাইজ, মারিব ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। সামরিক বিবরণে হুথিদের অবস্থান, কামান ও রকেটের অবস্থান, সরবরাহপথ এবং সামরিক সমাবেশস্থলকে লক্ষ্য করে আক্রমণের কথা উঠে আসে।
তবে সেদিনের জন্য কোন কোন গ্রাম বা সামরিক ঘাঁটি স্থায়ীভাবে হাতবদল হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।
০৭ অক্টোবর ২০২৬–সৌদি আরবের রিয়াদ ও আভা বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হুথি মিলিশিয়াদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর প্রকাশিত হয়। সৌদি পক্ষ পাল্টা আক্রমণে হুথিদের ৮০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় হামলার কথা জানায়।
এই ঘটনাগুলো ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের পাশাপাশি সৌদি ভূখণ্ড ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
০৮ অক্টোবর ২০২৬–ইয়েমেনের সরকারি সামরিক মুখপাত্রের পক্ষ থেকে হুথিদের পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, অস্ত্রভাণ্ডার, সরবরাহপথ এবং সামরিক শক্তিবৃদ্ধির অবস্থানকে লক্ষ্য করে ১,৭২৯টি আক্রমণ পরিচালনার দাবি প্রকাশিত হয়। সংখ্যাটি সরকারি পক্ষের দেওয়া হিসাব; স্বাধীনভাবে যাচাই করা মোট হামলার সংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
অন্যদিকে, হুথি মিলিশিয়াদের সামরিক মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের সংখ্যা ছিল ৫৯ এবং তাদের হিসাবে উত্তেজনা শুরুর পর মোট হামলা ১,৮৫৭টিতে পৌঁছায়। হুথিরা সৌদি বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবিও করে।একই সময়ে হুথিরা তাইজের আকাশে একটি সৌদি-সংশ্লিষ্ট তুর্কি-নির্মিত সশস্ত্র নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি জানায়।
০৯ অক্টোবর ২০২৬– এদিন বাব আল মান্দেব প্রণালীকে সম্পূর্ণ হুথিমুক্ত বলে ঘোষণা দেন সরকারি বাহিনী। জাতিসংঘের তরফ থেকে ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দিকে ফিরে গেছে এবং একাধিক ফ্রন্টে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে।
তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, মোখা ও বাব আল-মান্দেব উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের অগ্রগতির পর তাইজ শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণের উচ্চভূমি এবং লাহজ অঞ্চলে তীব্র লড়াই চলছিল। এর জবাবে সরকার সপ্তাহের শুরুতে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে এবং বাব আল-মান্দেবের আশপাশের কিছু এলাকা পুনর্দখলের দাবি করে। মারিব, আল-জাওফ ও হাজ্জাহ প্রদেশেও লড়াই তীব্র হয়। সান’আ বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার অভিযোগও আসে হুথি মিলিশিয়াদের কাছ থেকে।


