গাজীপুরে জামাত পরিচালিত মাদ্রাসায় চুমু ও শাহজালাল রুমির চড়–থাপ্পড় কান্ডের ঘটনা : কী বলছেন নেটিজেনরা

আহসান শেখ  :  সম্প্রতি গত ২১ ও ২২ অক্টোবরের মধ্যবর্তী সময়ে গাজীপুর জেলার টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকায় ক্বরিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় প্রথম শ্রেণির সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ওই মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল কর্তৃক চুমু দেওয়া ও এর জেরে পরবর্তীতে রাতে সেই ছাত্রীর পিতা শাহজালাল রুমি কর্তৃক সেই মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপালকে চড় থাপ্পড় দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। যা নিয়ে দেশে হঠাৎ অনলাইনে অফলাইনে উত্তেজনা শুরু হয়েছিল। কেউ কেউ ঘটনাটিকে কওমী মাদ্রাসার ঘটনা হিসেবে প্রচার করলেও পরবর্তীতে জানা যায় আউচপাড়ার সেই মাদ্রাসাটি জামাতে ইসলামীর লোকজনদের পরিচালিত আলিয়া মাদ্রাসা।

বিজ্ঞাপন
Advertisement

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শিশুটির স্বজন ও উপস্থিত জনতা শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করার একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে শাহজালাল রুমি নামের এক ব্যক্তি “কিসের চুমু রে” বলে ওই শিক্ষককে চড় (থাপ্পড়) মারেন। এরপর উপস্থিত জনতা তাকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে।ভুক্তভোগী শিশুর বাবার করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেম আহম্মদকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ঘটনার সত্যতা পেয়েছে।ঘটনার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পাল্টা অভিযোগ এনেছে যে, অভিভাবকের নেতৃত্বে একদল লোক মাদ্রাসায় ভাঙচুর চালিয়েছে এবং প্রায় ১৭ লাখ টাকা লুট করেছে। তবে শিশুর বাবা সংবাদ সম্মেলন করে এই অর্থ লুটের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এবং জানিয়েছেন যে তিনি কোনো ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে যাননি, বরং নিজের মেয়ের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়েছিলেন।শিক্ষককে থাপ্পড় মারা শাহজালাল রুমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, তিনি কোনো আলেম বা মাদ্রাসার বিপক্ষে নন, বরং একজন দুশ্চরিত্র লম্পটকে শাস্তি দিতেই এই কাজ করেছেন। তিনি আরও জানান, এখন থেকে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় লড়বেন।

 

কওমী দেওবন্দী পন্থী নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া : সাম্প্রতিক এই ঘটনা নিয়ে জামাত, কিছু বেরলভী সুফি এবং বামপন্থী সহ অনেক লোকজন কর্তৃক গাজীপুরের সেই ঘটনাকে কওমী মাদ্রাসার ঘটনা বলে অনলাইনে ব্যাপকভাবে প্রোপাগান্ডা প্রচার চালিয়েছিলো তবে এই প্রোপাগাণ্ডার জবাবে কওমী দেওবন্দী ঘরানার অনেকেই ঘটনাটির সাথে কওমী মাদ্রাসার কোন সম্পর্ক নেই এবং সেই মাদ্রাসাটিও কোন কওমী মাদ্রাসা নয় বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।

 

এক ফেসবুক পোস্টে কওমী দেওবন্দী ঘরানার অন্যতম একটিভিস্ট, বিভিন্ন ইসলামী বইয়ের অনুবাদক, ঢাকার একটি কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মহিউদ্দিন কাসেমী বলেন : টঙ্গীর মাদরাসাটা আলিয়া। চালায় জামাতিরা। গালি খাচ্ছে কাওমিরা। আবার সেই গালি গুলা দিচ্ছে জামাতিরাই।

তিনি আরেক পোস্টে বলেন : টঙ্গীর মাদরাসাটি একটি আলিয়া মাদরাসা। অভিযুক্ত নিজে মেয়েটিকে চুমু খাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। এরপরও জামাতি সফট টুলগুলো এক্টিভ হয়ে আলেমদের বিভ্রান্ত করতে শুরু করেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে কতিপয় ধান্ধাবাজ সার্ভিস প্রোভাইডার।অবাক হয়ে দেখতে হচ্ছে এই ঘটনায়ও তারা আলিয়া বোর্ডের পরিবর্তে সাধারণ আলেমদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানাচ্ছে। অথচ, কিন্তু কেন সাধারণ আলেমদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে? এই মাদরাসাটি তো আর সাধারণ আলেমদের পরামর্শে পরিচালিত হচ্ছে না।

 

বিদেশ ফেরত জনৈক স্কলার তো মাদরাসাওলাদের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের নিতে হওয়ার আক্ষেপ নিয়ে ঘুমাসে পড়েছেন। ঘুম ভাঙ্গলে ভাইটি আর আলিয়া মাদরাসা বোর্ডকে নিয়ে পোস্ট করার প্রয়োজনবোধ করবেন না। অথচ, চিপায় চাপায় গড়ে ওঠা কোনও প্রাইভেট মাদরাসায়ও এমন ঘটনা ঘটলে এতক্ষনে তারা গোলটেবিল বৈঠক ডেকে বেফাক-হাইআতুল উলিয়ার গোষ্ঠী উদ্ধার করে ফেলত।

কথা সেইটা না৷ কথা হইলো জামাত ঘরাণার আলিয়া মাদরাসাটি আক্রান্ত হলে নিজেদের জনবল না ডেকে কাওমি আলেমদের ডাকছে কেন? প্রতিরোধে ঝাপিয়ে পড়তে উসকানি দিচ্ছে কেন? কারণ, তারা জানে এদের কামলা হিসেবে পাওয়া খুবই সহজে।একটা মাদরাসায় অঘটন ঘটলে সেখানে বোর্ডের কাজ কী সেটাই আমি আজ অবধি বুঝলাম না। টঙ্গীর এই ঘটনায় আপনি কি আলিয়া মাদরাসা বোর্ডের কোনও দায় দেখছেন?

অভিযোগ উঠেছে; দেশে আইন আদালতও আছে। ঘটনার বাস্তবতা না যেনে অভিযুক্ত আলেমের পাশেই দাঁড়াতে হবে, এইটা কি আসাবিয়াত না? হয়তো বলবেন, মব হয়েছে। তার জন্যও আইন আদালত আছে। আইনের আশ্রয় নিন।

 

চট্টগ্রামের মেখল হাটহাজারীর মাহমুদ বিন মাদানী তার পোস্টে লেখেন : জামাতিরা অভিশপ্ত জাতি হবার দিকে কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই-

টঙ্গীতে হুজুর পিটানো মাদ্রাসাটি জামাতের।

কিন্তু জামাতিরা মনে করে, মাদ্রাসা মানেই কওমী, মনস্তাত্ত্বিকভাবে জামাতিরা মনে করে, দ্বীনি ইলম শিক্ষা কমপ্লেক্সের সাথে তারা সম্পৃক্ত নয়, এজন্য তারা দলবল মিলে উক্ত ঘটনায় কেরোসিন ঢেলেছে।অথচ সেই মাদ্রাসা এবং মার খাওয়া হুজুর, সবগুলো জামাতের।

অপরদিকে কওমী আলেমরা একবারও জানতে চায়নি ওটা কোন মাসলাকের মাদ্রাসা, কোন গোত্রের হুজুর।

আইন হাতে তুলে নেয়ার কারণে সবাই সরব হয়ে উঠেছে।

 

ফাদুলুল্লাহ জাবের তিনি তার পোস্টে লেখেন : মাদ্রাসাটা হচ্ছে আলিয়া, চালায় জাশির লোকেরা, গালি খাচ্ছে কওমিরা। আর গালিগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে কে, জামাত ও সুন্নীরা। সেই গালির জবাব না দিয়ে ইমেজ ক্লিন করতে একেকজন কওমী ফেসবুক মুরুব্বি উত্তর গেট থেকে আন্দোলনের ডাক দিয়ে দিচ্ছে!

ভাইরে,একটু তো তাহকিক করবেন!”

উল্লেখ্য গাজীপুরের সেই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল জামাতে ইসলামীর লোকজনের পরিচালিত বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও সরেজমিনে জানা গিয়েছে।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img