‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন’ এটি দেওনার পীর নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষ সিন্ডিকেট। আওয়ামিলীগের আমলে প্রকাশ্যে গরম বক্তৃতা দিয়ে বিপ্লবী সেজে রাতের আধারে আওয়ামিলীগ সরকারের স্বার্থ রক্ষাই ছিল এই সিন্ডিকেটের মূল কাজ। আলেম সমাজকে বিভ্রান্ত করে কৌশলে আওয়ামী বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম থেকে বিরত রাখাই ছিল এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রজেক্ট। এমনকি দেওনার পীর মিজানুর রহমান তাঁর আয়ত্তাধীন আলেম উলামা ও ইমামদের ডেকে নৌকায় ভোট দিতে প্রকাশ্যেই নির্দেশনা দিতেন।
এই সিন্ডিকেট আওয়ামীলীগের আঠারো-চব্বিশের মেয়াদে সরকারের কাছে এই মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল যে, আওয়ামিলীগ সরকার চুড়ান্ত রকমের বিব্রত হয় এমন কিছুই তারা কখনোই করবে না। তারই অংশ হিসেবে ২০২১ সালে মোদীর আগমনের প্রাক্কালে মামুনুল হক হেফাজতের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করে মোদীর আগমন ঠেকাতে কোন কর্মসূচী না দেয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এই সময় মামুনুল হক সরকারের সাথে করা কমিটম্যান্ট এবং নিজের খ্যাতির বিড়ম্বনা ব্যালেন্স করতে গিয়ে হযবরল পাকিয়ে ফেলেন। যার ফলে সরকার এই সিন্ডিকেটের উপর চরম ক্ষিপ্ত হয়।
মোদীর আগমনকে ঘিরে মূলত সেদিন হেফাজত কিংবা মামুনুল হকের কোন কর্মসূচী ছিল না। কিন্তু জুমার নামাজের পর মোদীর প্রতি ঘৃণা প্রদশর্ন করে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বাধভাঙ্গা ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত জনতা। এতে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশের হামলায় ব্যাপক হতাহতের খবর আসতে থাকে। ফলে দিন বাড়ার সাথে সাথে সংঘাত অগ্নিমূর্তি ধারণ করতে থাকে। এদিকে মোদীর বিরুদ্ধে কোন আন্দোলন না করার ঘোষণা দেওয়া মামুনুল হকের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ঠিক এই সময়েই খ্যাতিপাগল মামুনুল হক ছুটে যান বাইতুল মাকাররমে। উদ্দেশ্য ছিল এক ঢিলে দুই পাখি শিকার- একদিকে বিক্ষুব্ধ জনতার মাঝে উপস্থিত হয়ে নিজের খ্যাতির ধ্বস ঠেকানো, অপরদিকে সরকারের কাছে দেয়া কমিটম্যান্ট রক্ষার্থে কৌশলে জনতার ক্ষোভকে প্রশমিত করে তাদেরকে ঘরে ফেরানো।
ঠিক এই যায়গাটাতেই সব গুলিয়ে ফেলেন মামুনুল হক। বেলা যতই গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে থাকে ততই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন মামুনুল হক। সন্ধ্যায় হেফাজতের ঢাকার নেতারা করনীয় ঠিক করতে মিটিংয়ে বসেন। এই মিটিংয়ে শুরু থেকেই কোন ভুমিকা ছাড়াই চুপচাপ বসে থাকেন মামুনুল হক ।
মিটিংয়ের মাঝামাঝি সময়ে মামুনুল হকের আরেক সিন্ডিকেট পার্টনার মনীর কাসেমী হাজির হলে মুহুর্তেই মিটিংয়ে চিত্র পাল্টে যায়। নড়েচড়ে বসেন মামুনুল হকও। শুরু হয় তওহীদী জনতার রক্ত নিয়ে নতুন খেলা। সারাদেশে কোন যোগাযোগ এবং সমন্বয় ছাড়াই মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত গড়ায় হরতালের দিকে। চরম এই হঠকারী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দেশের আলেম উলামাকে ঠেলে দেয়া হয় এক অগ্নিগর্ভে। এরপরের ইতিহাস তো সকলেরই জানা।
পরদিন ব্যাপক হতাহতের মধ্যদিয়ে পালিত হয় হেফাজতের অনিয়ন্ত্রিত হরতাল। সফল রক্ত বানিজ্য শেষে সিন্ডিকেট হোতারা মেতে উঠেন রিলাক্সে। রাবেতা সিন্ডিকেটের দুই নাটের গুরু হাসান জামিল ও আয়ুবীর পরামর্শে গোপন পত্নী নিয়ে রিসোর্টে রিফ্রেশমেন্টে যান মামুনুল হক। রচিত হয় ঐতিহাসিক ‘বিজয়ের প্রতীক’ ৫০১। এই সার্বিক কর্মকাণ্ডের ফলে দেওনার পীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাবেতা সিন্ডিকেটের উপর চরম ক্ষুব্ধ হয় সরকার। সকলের উপর নেমে আসে গ্রেপ্তারের খড়গ। তাদের কারণে ভুক্তভোগী হয় দেশের ইসলামপন্থী সকল আলেম উলামা ও নেতৃবৃন্দ।
পরে দেওনার পীর সাহেব সরকারের কাছে নাকে ক্ষত দিয়ে তদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। জেল থেকে মুক্ত করে রাবেতা সিন্ডিকেটের নেতাদেরকে পুণরায় আওয়ামী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দরবারে পাঠিয়ে তাদের পুরোনো প্রতিশ্রুতি নবায়ন করান দেওনার পীর। এই প্রতিশ্রুতি তারা ৫ই আগস্ট আওয়ামিলীগের শেষ ঘন্টা বাজার আগ পর্যন্ত রক্ষা করেন।
এই রাবেতা সিন্ডিকেট হচ্ছে পুতির মালার মত। এখানে একজনের সাথে আরেকজনের স্বার্থ আর গোমর অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। এখানে একজন ধরা খেলে সকলেরই মুখোশের আড়ালের আসল চেহারা ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। আর এদের প্রাণভোমরা হচ্ছে মামুনুল হক। এইজন্যই মামুনুল হক কোন সংকটে পড়লে এই সিন্ডিকেট একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে রক্ষা করতে। এইজন্য রিসোর্ট কান্ডের পর তাকে রক্ষায় এই সিন্ডিকেটের সবাই যেমন একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তেমনি এইবার ওলিপুরী ঝড়ের পরও বিধ্বস্ত মামুনুল হককে উদ্ধারে পুনরায় এগিয়ে এল রাবেতা সিন্ডিকেট।
এখানে বলে রাখা ভলো, এই রাবেতা সিন্ডিকেটের বাহিরে মনীর কাসেমী, জুনায়েদ আল হাবীব ও আজিজুল হক ইসলামাবাদীর সমন্বয়ে মামুনুল হকের আরেকটি পকেট সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আগেই বলেছি, মামুনুল হক আপাদমস্তক একজন খ্যাতিপাগল মানুষ। খ্যাতির জন্য তিনি গাছেরটাও খেতে ছাড়েন না, তলেরটাও কুড়াতে বাদ রাখেন না। রাবেতা সিন্ডিকেট দিয়ে তিনি সাউথ ব্লক ম্যান্টেন করেন, আর কাসেমী-হাবীব সিন্ডিকেট দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন ব্লক মেন্টেন করেন। এইজন্য মামুনুল হকের যেকোনো বিপদে রাবেতা সিন্ডিকেট ও কাসেমী সিন্ডিকেট একযোগেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেমনটা রিসোর্ট কাণ্ডের পরও দেখা গিয়েছিল, তেমনটা ওলিপুরী ঝড়ের পরও দেখা গেল।


