নির্মোহ বিশ্লেষণে আমাদের দুই জাতীয় অভিভাবক আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.) ও আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (দা. বা.) এবং কিছু অপ্রিয় প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: 10:55 PM, September 25, 2020

উল্লেখিত মনীষীদ্বয় নানা কারণেই আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আর তাই উল্লেখিত মনীষীদ্বয়কে নিয়ে আমাদের এই বিশ্লেষণ এ জন্য যে, তাঁদের নেতৃত্ব-গুণ ও দূরদর্শী পরিকল্পনার উপর এদেশের মুসলমানদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের অনেক কিছুই নির্ভর করছে।

এঁদের একজন সদ্য প্রয়াত। রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। আরেকজন এখনো আমাদের দ্বীনী ময়দানের অন্যতম সিপাহ্ সালার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বারাকাল্লাহু ফি হায়াতিহী।

শাইখুল ইসলাম হযরত আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.) এই মাত্র দিন কয়েক আগে বাংলাদেশসহ সমগ্র উম্মতে মুসলিমাকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মহান মাওলা পাকের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন।

শতাব্দীর অন্যতম গণজাগরণের মহানায়কের জীবনের শেষ দিনগুলোর নানামুখী অস্বস্তি এবং অনুসারী ও সতীর্থদের প্রতি এক বুক অভিমান নিয়ে এভাবে চলে যাওয়াটা কেউই যেন মেনে নিতে পারেন নি। আর জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁর এই অস্বস্তিবোধের জন্য একমাত্র দায়ী ছিল তাঁর অযোগ্য সন্তান ও চারপাশে হিতাকাঙ্খির ছদ্মবেশে সদা তৎপর আলেম-উলামার ছদ্মবেশে কতিপয় উচ্ছিষ্টভোগী দালাল।

শুরু থেকেই ঈর্ষনীয় সফল ব্যক্তিত্বের অধিকারী সর্বমহলে সমাদৃত এই মনীষীর বর্ণাঢ্য কর্ম-জীবনের শেষ কয়েকটি বছর এই দালাল শ্রেণী দ্বারা মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে তাঁর নিজের এবং উম্মাহর জীবনে যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে- তা সহজে পূরণ হবার নয়।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় এই যে, কুপুত্রের প্রতি স্নেহান্ধ এই মনীষী জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এটাই জেনে গেছেন যে, তাঁর অঘটন পটিয়সী পুত্রধন এবং তাঁকে সর্বদা ঘিরে থাকা দালাল শ্রেণীর সদস্যগণ নির্দোষ।

বরং যারা তাদের এসকল কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছে তারাই ভুল পথে আছে এবং বিরোধিতাকারীদের কেউ তাঁর কিংবা তাঁর পুত্রের হিতাকাঙ্খী নয়।

কেননা, জীবনের শেষ সময়ে এসে এই সকল বিষয় নিয়ে তাঁর ছাত্র ও ভক্তদের মাঝে সৃষ্ট বিক্ষোভ এবং অসন্তোষের সময়ও তিনি দৃঢ়তার সাথে এই বলে প্রকৃত হিতাকাঙ্খিদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, তোমরা আমার ছেলে ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের কোন একটি ভুল আমাকে প্রমাণসহ দেখিয়ে দাও!

হায় আফসোস! পুত্রস্নেহে অন্ধ এই দেশবরেণ্য শতবর্ষী মনীষীকে মৃত্যুশয্যায় কে বলতে যাবে যে, আপনার কুপুত্রের ষোলআনা কর্মকাণ্ডই যেখানে নেতিবাচক, সেখানে তার কয়টি দোষ এবং বিচ্যুতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালে পর আপনি বিশ্বাস করবেন যে, সে সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে না।

যেখানে দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম এই শতবর্ষী মনীষীর সামনে কখনো উচ্চ আওয়াজে কথা বলেন নি, সেখানে ষোল থেকে চব্বিশ বছরের তরুণ শিক্ষার্থীরা কোন স্পর্ধায় তাঁর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পুত্রধনের অসংখ্য অপকর্মের ফিরিস্তি এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় মনীষীর সামনে পেশ করবে!

আর এই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার দ্বারাই আন্দাজ করা যায় যে, তাঁর কুপুত্র ও দালাল শ্রেণী তাঁকে প্রকৃত অবস্থা অবগত করা থেকে কতটা অন্ধকারের মধ্যে রেখেছিলেন।

প্রকৃত শত্রু-মিত্র চেনার ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের বেলায় মেনে নেয়া গেলেও- তাঁর ন্যায় প্রভাবশালী জাতীয় ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে তা কখনই মেনে নেয়া যায় না।

কারণ, তিনি কেবলমাত্র ব্যক্তি-বিশেষ ছিলেন না। বরং তিনি নিজ কর্মগুণে পরিণত হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র জাতির অগ্রপথিক ও নেতৃপুরুষরূপে। আর তাই তাঁর ভালো-মন্দ কাজ-কর্ম বা সিদ্ধান্তের প্রভাব তাঁর সাথে সাথে সমগ্র জাতিকে প্রভাবিত করেছে।

তিনি একটি বারের জন্যও এটা ভেবে দেখলেন না যে, তাঁর পূর্বসূরী উলামায়ে কেরামের সাথে যে সরকার তাঁদের জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত বিমাতা-সূলভ আচরণ করে গেছে।

সেই সরকার রাতারাতি কিভাবে তাঁর পরম হিতাকাঙ্খীতে পরিণত হয়ে গেল? আসলে বয়সের ভারে নূহ্য এই মনীষীকে তাঁর অসহায়ত্বের সুযোগ গ্রহণ করে দালালরা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। তাঁর পাহাড় সম ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তাকে সস্তা দামে বিক্রি করে দিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করেছে।

আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.)-এর জীবনের শেষ কয়েকটি বছর তাঁর কুপুত্র ও তাঁকে ঘিরে থাকা দালালদের দিয়ে তাই করা হয়েছে। আর তাঁর ইন্তেকালের পর যতই আমরা তাঁকে মহিমান্বিত করি না কেন, আগামী প্রজন্ম তাঁর বর্ণাঢ্য সফল কর্ম-জীবনের পাশাপাশি জীবনের শেষ কয়েক বছরের তৎপরতাকে বাঁকা চোখেই দেখবে।

আর সেটা তাঁর নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি বা কর্মকাণ্ডের জন্য নয় বরং জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁকে সর্বদা ঘিরে থাকা দালালদের নানামুখী অপকর্মের কারণে।

আর দারুল উলুম দেওবন্দের উসুল ও কওমীয়তের স্বাতন্ত্র রক্ষা করে সরকারী সীকৃতি আদায়ের এই অবিশ্বাস্য গাজাখোরী গল্প আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.) ও তাঁর নেতৃত্বাধিন কওমী উলামায়ে কেরামকে ঐ দালাল শ্রেণীই নিজেদের স্বার্থে গিলিয়েছিল।

আফসোস যে, তিনি এর শুরুটা করে গেলেন, কিন্তু নির্মম সমাপ্তিটা দেখে যেতে পারলেন না।

সেই সাথে এটাও সত্য যে, আগে যাই ছিল, কিন্তু সরকারী সীকৃতি লাভের সাথে সাথে বেফাক ও হাইআতুল উলইয়াও এখন রসের হাড়িতে পরিণত হয়েছে। অতএব অদূর ভবিষ্যতে এই সংস্থা দুটোর পদ-পদবী যে সুযোগ-সন্ধানী দালাল শ্রেণীর কারো কারো ভাগ্য বদলে দিবে- সেটা আমাদের সরল-মনা আকাবীরগণ না জানলেও, তাঁদের লেজ আঁকড়ে থাকা ধুর্ত প্রকৃতির দালাল শ্রেণী বিলক্ষণ জানে।

আর জানে বিধায় এই সংস্থা দুটির নিয়ন্ত্রণ লাভের বিষয়টি বর্তমানে ঝগড়া-ফ্যাসাদের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আমাদের সরল-মনা আকাবীরগণকে এই ফিৎনা থেকে হেফাযত করুন।

এবার আসা যাক আমাদের বর্তমান সময়ের আরেক নির্ভরযোগ্য রাহবার শাইখুল ইসলাম আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (দা. বা.)-এর প্রসঙ্গে। কেননা, জাতীয় পর্যায়ে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.)-এর মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের উলামায়ে কেরাম ও সচেতন মহল তাঁর নেতৃত্বের উপরই ভরসা করে আছেন।

আর অতিরঞ্জিত না করেও বলা যায় যে, সেই যোগ্যতা ও দক্ষতা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁকে দান করেছেন। বিগত পঞ্চাশ বছর যাবত এদেশের কওমী ঘরানা ও ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে তাঁর অবদান কিংবদন্তিতুল্য।

আর নিজ কর্ম-পরিধির নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি কর্ম-জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এক অনন্য নজীর স্থাপন করে চলেছেন। অর্থাৎ, আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.) যেখানে জীবনের সবচেয়ে সফল সময়টাতে কুপুত্র ও দালালদের কারণে নিজ ঘরানার লোকদের কাছে নানাভাবে সমালোচিত হয়েছেন।

সেখানে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (দা. বা.) নিজ কর্ম-পরিধিকে পুত্র ও পরিবারের প্রভাব থেকে আজ পর্যন্ত কঠোরভাবে বিমুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এটা তাঁর কর্ম-জীবনের অনন্য ও বিরল এক সফলতা। এখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের এক অসাধারণ উপমা। এতে কোনই সন্দেহ নেই, তবে তিনি কি সেই সাথে চাটুকার এবং দালাল-মুক্ত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কোন রকম ভনিতা ছাড়াই বলা যায় যে, আগে মুক্ত থাকলেও কর্ম-পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে বর্তমান সময়ে তিনিও চাটুকার এবং দালাল-মুক্ত নন।

কারণ, তাঁকে যারা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, এমন যে কেউ একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাবেন যে, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে কওমী অঙ্গনে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.)-এর কুপুত্র কেন্দ্রিক নানামুখী জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে প্রকৃত কওমী দরদীদের একটি বিরাট অংশ যেমন আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (দা. বা.)-এর দিকে ঝুকে পড়েছে।

ঠিক তেমনি কওমী দরদীর লেবাসধারী এক শ্রেণীর চাটুকার দালাল ও সুযোগ-সন্ধানী অতি ধুর্ত ব্যক্তিবর্গও তাঁর আশ-পাশে এসে হিতাকাঙ্খীরূপে ভীড় জমিয়েছে।

এদের কেউ কেউ তার নিজ ঘরানার মধ্য থেকে যেমন আছে, ঠিক তেমনি সমমনা চিন্তা-ফিকিরের দাবীদার বহিরাগত থেকেও রয়েছে।

তিনি এই বিষয়ে কতটুকু সচেতন ও সজাগ আছেন জানি না, তবে পরিস্থিতি দৃষ্টে মনে হচ্ছে- আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.)-এর মত তাঁকেও ভিতর ও বাইরের দালাল এবং চাটুকার শ্রেণী ইতোমধ্যেই অনেকটা ঘেরাও করে ফেলেছে।

আর ঐ দালাল ও চাটুকার শ্রেণী কর্তৃক দিবা-রাত্র তাঁকে বোঝানো হচ্ছে যে, বর্তমান সময়টা যেহেতু খুবই নাজুক, বিধায় আপনাকে এই এই কর্মসূচী নিয়ে ময়দানে সরব এবং সক্রিয় থাকতে হবে।

এভাবেই তাঁর কাঁধে ভর দিয়ে চাটুকারদের কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে খুবই তৎপর হয়ে উঠেছে।

আমরা মনে করি পরিস্থিতি ও সময় প্রত্যেককেই তাঁর স্ব স্ব যোগ্যতা, কর্মতৎপরতা ও অবদান অনুযায়ী মূল্যায়ন করে থাকে। এখানে কৃত্তিম তৎপরতার কোন প্রয়োজন পড়ে না।

অতএব সময়ের নাজুকতাকে অজুহাত বানিয়ে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে অতি উৎসাহী চাটুকার ও দালাল শ্রেণী শেস পর্যন্ত জাতির শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের ঐ ক্ষতিটাই করে থাকে- যা অতি সম্প্রতি সমগ্র দেশবাসীর চোখের সামনে মহীরূহ-তুল্য ব্যক্তিত্ব আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.)-এর বেলায় ঘটেছে।

আর এই ক্ষতি শুধুমাত্র ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয় না, বরং পুরো জাতির জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়।

আর কোন জাতির রাহবার যখন কওমের স্বার্থের চেয়ে পরিবার ও তাঁকে ঘিরে থাকা দালাল ও চাটুকারদের স্বার্থকে বড় করে দেখেন তখন ঐ রাহবার জাতিকে পরিচালনা করার নৈতিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। কেননা, তখন তিনি নিজেই পরিচালিত হন ষড়যন্ত্রকারী তৃতীয় পক্ষ দ্বারা।

আর ইসলামী অঙ্গনের এই দুর্ভাগ্য শুধুমাত্র সাম্প্রতিক সময়ে নয় বরং কয়েক শতাব্দীব্যাপী মুসলিম বিশ্বের নানা আন্দোলন-সংগ্রামকে কেন্দ্র করে ঘটে চলেছে। ইতিহাসের সেই দুর্ভাগ্য জনক অধ্যায়ে সম্ভবতঃ আমরা ও আমাদের আকাবীরগণও আজ ক্রমান্বয়ে ঢুকে যাচ্ছি।

জাতির সম্ভাব্য আগামী দিনের অভিভাবকদের ঘিরে দালালদের বিশাল এক চক্র ময়দানে সক্রিয় রয়েছে। বড় বড় লকবধারী এই কুচক্রীদের দালাল বলে চিহ্নিত করারও কোন উপায় নেই।

কারণ, তারা আকাবিরদের কোলে এবং কাঁধে চেপে বসে আছে! মঞ্চে-ময়দানে আকাবিরদের সামনে বসিয়ে এই চাটুকার শ্রেণী নিজেদের মসলক-মশরবের বিপরিত মেরুর লোকদের অনবরত হুমকী-ধমকী দিয়ে চলেছে।

তাদের এই হুমকী-ধমকীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যারা উপলব্ধি করতে সক্ষম, তারা বিলক্ষণ জানেন যে, এই ধান্দাবাজ শ্রেণীটি আসলে এই সকল লম্ফ-ঝম্ফ করে মূলতঃ নিজেদের স্বার্থের ময়দান পরিস্কার করছে।

এখন সময়ের তাকীদে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রাহ্.)-এর পর জাতির একজন সর্বজন-মান্য অভিভাবকের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আর এই সুযোগে নানান মসলক-মশরবের ভক্ত-অনুরক্তদের মুখে চতুর্দিক থেকে আজ বহু জাতীয় অভিভাবকের নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, সেই অভিভাবকদের একজনের মুখে অন্যজনের নাম কিংবা যোগ্যতার স্বাক্ষ্য ঘুণাক্ষরেও কেউ কখনো শুনেছেন বলে আমাদের জানা নেই।

এই হচ্ছে আমাদের অভিভাবক শ্রেণীর উদারতার নমুনা। অতএব যারা নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে যোগ্য কিংবা সতীর্থরূপে ভাবতে পারেন না, তারা জাতির অভিভাবক হওয়া তো দূরের কথা- নিজের বউ-বাচ্চার অভিভাবক হওয়ারও যোগ্যতা রাখেন না।

আসলে আমাদের কওমী প্রজন্ম বিগত ২০১৩ সালের ৫ মের পর থেকে সত্যিকার অর্থে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। কারণ, উল্লেখিত সময়ের মধ্যে প্রতীকী অভিভাবক ছাড়া কওমী অঙ্গনে কার্যকর কোন শক্তিশালী অভিভাবক ছিলেন না বা থাকতে দেয়া হয়নি।

অতএব অনতিবিলম্বে এই শুন্যস্থান যথার্থ অর্থে পূরণ করতে না পারলে ঐতিহ্যবাহী এই ধারাটি প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অভিভাবকত্বের অভাবে বিলুপ্তও হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

কারণ, ইতোমধ্যেই আমাদের উলামায়ে কেরামের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-কলহকে কেন্দ্র করে ‘সরকারী কওমী মাদরাসা বাংলাদেশ’ ও ‘বেসরকারী কওমী মাদরাসা বাংলাদেশ’ এমন দ্বৈত ধারার একটি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন করার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী ধারাটিকে বিভক্ত করার ভয়ানক পায়তারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কেননা, আমাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিভেদ-অনৈক্য এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, বিনা বাধাতেই এই পরিকল্পনা চোখের পলকে বাস্তবায়ন হয়ে যাবে।

অতঃপর নতুন আঙ্গিকে আবারো শুরু হবে নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-কলহ এবং কাঁদা ছোড়াছুড়ি। এভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হতে হতে এক সময় ঐতিহ্যবাহী কওমীধারা তার স্বকীয়তা হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

আগামী প্রজন্ম সেই কওমী ধারার ধ্বংসাবশেষ তথা রেখা-চিহ্ন দেখে বুকের গভীর থেকে বেদনা ভারাক্রান্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলবে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের মাঝে কওমীধারা নামে একটি ঐতিহ্যবাহী শক্তিশালী বুনিয়াদি শিক্ষাধারা প্রতিষ্ঠিত ছিল!!!

যেমনটি আজ সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ স্পেনের কর্ডোভা ও বাগদাদের দিকে তাকিয়ে বলে থাকে, অতীতে কোন এক সময় এই শহরগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগের বিনিময়ে সারাবিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার কেন্দ্র-বিন্দু ছিল।

আহমদ বদরুদ্দীন খান
সম্পাদক: মাসিক মদীনা
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০