ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আমার রাজনৈতিক পত্র

প্রকাশিত: 9:39 AM, September 28, 2020

সৈয়দ শামসুল হুদা 

বাংলাদেশের একটি আলোচিত অন্যতম রাজনৈতিক দলের নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সরকারে থাকা আওয়ামীলীগের বাইরে যে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানেও খুব দাপটের সাথে চলছে সেই দলটির নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, দর্শন সম্পর্কে কৌতুহল থাকাটাই স্বাভাবিক। সে কৌতুহল থেকেই আজকের পর্যবেক্ষণ। জানতে চাওয়া। বিশ্লেষণ। হয়তো এতে অনেকেই মনক্ষুন্ন হবেন। ক্ষুদ্ধ হবেন। আবার বোদ্ধা কেউ হয়তো আমাকে ভালোও বলবেন। সে সব মাথায় রেখেই কিছু কথা, কিছু কাজ, কিছু বিষয় আমার প্রিয় বন্ধুদের দৃষ্টিতে আনতে চাই। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টাও তুলে ধরতে চাই।

গত প্রায় ১২ বছরে আসলে আপনাদের অর্জনটা কি? এতটা অবাধে কাজ করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আপনারা জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাবশালী শক্তি হযে উঠতে পেরেছেন? গত একযুগে আপনারা জাতিকে কী উপহার দিয়েছেন? অথবা আপনাদের দলীয় শক্তি, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে আপনারা কতটা অগ্রগতি অর্জন করেছেন? সাংগঠনিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে আপনারা কী কী বড় বড় পরিকল্পনা, বা মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আপনারা দিন দিন কওমী অঙ্গনের নিউ ভার্সন হয়ে উঠছেন। মাঝে মাঝে রাস্তায় বড় ধরণের শোডাউন ভিন্ন গত একযুগে আপনাদের অর্জন কি? রাজনৈতিক অর্জন, অর্থনৈতিক অর্জন, সামাজিক অর্জন, শিক্ষা ও প্রশাসনিক অর্জন, গবেষণা ও চৈন্তিক বিষয়ে আপনাদের অর্জন আজ বিশ্লেষণের দাবি রাখে। রাষ্ট্রে প্রভাবক শক্তি হয়ে উঠার জন্য আপনাদের দলীয় মতাদর্শের লোকদের সরকারে এবং বেসরকারীভাবে কর্মসংস্থান তৈরীতে আপনাদের অর্জন কী তা আমাদের কাছে পরিস্কার নয়।

আপনাদের সকল কর্মীদের এটা পরিস্কার বিশ্বাস যে, আপনারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে অনেক আগেই পিছনে ফেলে আওয়ামীলীগ, বিএনপির পর আপনারা বৃহত্তম তৃতীয় শক্তি। অথচ গত এক যুগে আপনারা দেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। অপরদিকে জামায়াতের বন্ধুদের নিয়ন্ত্রনে এখনো যথাযথ গুরুত্বের সাথে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, আল মানারাত ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য নামি দামি প্রতিষ্ঠান তারা যথারীতিই চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত একযুগেও নিজেদের মতো করে আপনারা একটি ব্যাংকও গড়ে তুলতে পারেননি, কোন ইনসুরেন্স গড়ে তুলতে পারেননি। বড় ধরণের কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেননি। অথচ জামায়াতের বন্ধুদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংক, ফারইষ্ট লাইফ ইনসুরেন্স, বিডিফুডসহ অসংখ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান তারা সুন্দরভাবেই চালিয়ে যেতে পারছে।
মীর কাশেম আলী মরহুম এর মতো একজন নেতা আপনাদের মধ্যে এখনো দেখা যায় না। তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা হসপিটাল, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ, ইবনে সিনা নার্সিং ইন্সসিটিউটসহ অসংখ্য মেডিকেল সাপোর্টেড প্রতিষ্ঠান যা গড়ে তোলা হয়েছিল তা যথারীতি সুন্দরভাবেই চলমান। তাঁরই হাতে গড়ে দৈনিক নয়াদিগন্ত চলছে। দিগন্ত টিভি জোরপুর্বক বন্ধ করে না রাখলে সেটাও চলমান থাকতো। কিন্তু আপনাদের এক্ষেত্রে অর্জন কি? একটি সংগঠনকে যদি সমাজ যে সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে সে সকল জায়গায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরী করতে না পারে, তাহলে শুধু আবেগ দিয়ে কি খুব বেশিদূর যাওয়া যাবে?

দিন দিন আপনারা কওমীদের নিউ ভার্সন হয়ে উঠছেন। কওমীরাতো উসূলে হাস্তেগানা মেনে রাষ্ট্র থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে। কিন্তু আপনারাতো তা না। কওমীরা ৬এপ্রিলের মতো আসবে, ৫মে’র মতো হারিয়ে যাবে। এটাই নিয়তি। এর বাইরে আর কিছুই চাওয়া-পাওয়া নেই। কিন্তু আপনারাতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। অসংখ্য নেতাকর্মী। আপনাদেরতো ঢাকা শহরে দশতলা বিশাল ভবনে একটি দৈনিক পত্রিকা অফিস থাকার কথা, বিশতলা ভবনে একটি ব্যাংকের হেড অফিস থাকার কথা। থাকার কথা অসংখ্য গবেষণামূলক পত্রিকা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাদের পছন্দের লোকদের ব্যাপক প্রভাব থাকার কথা। অথচ প্রশাসনে আপনাদের ন্যুনতম কর্তৃত্বও তৈরী হয়নি। দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনাদের খুব সামান্যই উপস্থিতি। কিছু ছাত্রদের সম্প্রতি দেখা গেলেও শিক্ষকদের মধ্যে, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আপনাদের প্রভাব শুন্য। তাহলে আপনারা এদেশটাকে কীভাবে নেতৃত্ব দিবেন?
বাহির দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সাথে আপনাদের এখনো কোন প্রকার উঠাবসা দেখি না। অথচ সুদূর তুরস্ক থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী হলে রেসালায়ে নূরের আন্তর্জাতিক সেমিনার হয়। বদিউজ্জামান সাঈদ নূরসীর ওপর আলোচনা সভা হয়, যেখানে পুলিশের ডিআইজিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকে। দেশের উচ্চশিক্ষিত মহলসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আপনাদের সমর্থক, শুভাকাঙ্খি কতটা আছে তার কিছুই দৃশ্যমান নেই। দেশের পুলিশ বাহিনী, সেনা, নৌসহ সচিবালয়, বিভিন্ন মন্ত্রনালয়, দপ্তর, অধিদপ্তরে আপনাদের উপস্থিতি এখনো শুন্য। তাহলে আপনারা কীভাবে আশা করেন যে, খুব শীঘ্রই আপনারা রাষ্ট্রের একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থান তৈরী করে নিবেন?

আপনারা কওমী মাদ্রাসার গুতাগুতিতে পড়ে গেছেন। কারা কোথায় কোন সিন্ডিকেট করে, তা ভাঙ্গার জন্য আপনাদের নেতাকর্মীদের মতো উৎসাহের কোন কমতি দেখি না। আপনাদের দৃষ্টি থাকার কথা ছিল অনেক উপরে। অথচ আজকে নারায়ণগঞ্জে আটরশির একজন অখ্যাত আলেমকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে বিশাল জনশক্তিকে ব্যবহার করেছেন উলামা পরিষদের নামে। এসব করে আলোচনায় থাকা যায়। কিন্তু স্থায়ী শক্তি অর্জন করা যায় না।

আসলে আপনাদের অর্থনৈতিক পলিসিটা কি? আপনারা রাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে কী ভাবছেন? কীভাবে আপনারা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক সেবা দিতে চান? এসব বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়ত বড় বড় সেমিনার, আলোচনা সভা, গবেষণাপত্র বের করা দরকার ছিল। এখনো পর্যন্ত একটি মাসিক আল কারীম ছাড়া আর কোন পত্রিকা বের করতে পারেননি। কয়েকটি অনলাইন শুরু করেছেন মাত্র। রাষ্ট্রের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনাদের চিন্তা কি? দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আলী আশরাফ মরহুম দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ইসলামাইজেশন করার জন্য অনেক চেষ্টা করে গিয়েছেন। অনেক লিখনী জাতিকে উপহার দিয়েছেন। কিন্তু আপনাদের পক্ষ থেকে আজো জাতীয় শিক্ষার চাহিদা পূরণে এবং দেশের ভেঙ্গে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কোন প্রকার দিক নির্দেশনা আমাদের চোখে পড়েনি। তাহলে আপনারা কীভাবে দাবি করেন যে, আপনারা দেশের বড় একটি রাজনৈতিক শক্তি?

দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্প প্রতিষ্ঠা, পরিবহন সেক্টরে প্রাধান্য বিস্তারসহ কোন ক্ষেত্রেই আপনাদের কোন ভূমিকা নেই। তুরস্কের নেতা এরদোয়ানকে দেখুন, সে কীভাবে বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তুরস্ককে গড়ে তুলছে। তুরস্কে শত শত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এরদোয়ানদের। তারা শুধু দেশেই নয় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও কাজ করছে। ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তাদের অনেক প্রস্তুতি ছিল। তারা জাতির আস্থা অর্জন করেই ক্ষমতায় এসেছে। আর এখন রাষ্ট্রীয় শক্তিকে ব্যবহার করে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় কিছু মিছিল করা ছাড়া গত একটি যুগে কী উপহার আপনারা আমাদের দিয়েছেন তার হিসাব মিলিয়ে দেখবেন কি?

গত একযুগে আপনাদের ব্যাপক জনসমর্থক বেড়েছে। কিন্তু সেই জনসমর্থনকে জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য আপনাদের বিশেষ কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। দেশের ৫০% নারী সমাজ। তাদেরকে নিয়েই বা আপনাদের কী পরিকল্পনা সে সম্পর্কেও আমাদের কোন ধারণা নেই। দেশের নারী সমাজ এখন অনেক বেশি শিক্ষিত এবং সচেতন। তাদের সমর্থন ছাড়া আপনাদের পক্ষে রাষ্ট্রে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। এরদোয়ান সরকার নারীদেরকে বিশেষভাবে কাজে লাগিয়েছে। রেসালায়ে নূরের অফিসগুলোতে ইস্তাম্বুলে আমরা নারী সদস্যদেরও দেখেছি। কিন্তু আপনাদের দলের সাধারণ কর্মীরা অন্য কোন দলের নেতাদের সাথে বা পাশে কোন প্রকার নারীদের উপস্থিতি দেখলে যেভাবে এটাকে নিয়ে ট্রল করে তা দেখলে অবাক হই। প্রশ্ন জাগে, দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষিত কোটি কোটি নারী সমাজকে আপনারা অবহেলা করে, দূরে সরিয়ে রেখে কতদূর যেতে পারবেন? এসব বিষয়ে আপনাদের পরিস্কার হওয়া দরকার।

আপনাদের দলীয় রাজনৈতিক গবেষণা কতটুকু আছে জানি না। কিন্তু আমরা এর কিছুই দৃশ্যমান দেখি না। দেশের বিভিন্ন সেক্টর নিয়ে আপনাদের বিভিন্ন গবেষণা সেল কাজ করার কথা। দেশের জেনারেল শিক্ষিত কত পার্সেন্ট লোক আপনাদের দলের সক্রিয় সমর্থক তা জানি না। তবে এদেরকে সামনে নিয়ে আসার কোন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। এদেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইনবিভাগ, প্রশাসন, ব্যাংকিং সেক্টর, শিক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে আপনাদের জনবল বৃদ্ধি করা দরকার।

সর্বোপরি আপনাদের দলীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে গণবান্ধব পরিবেশ তৈরী করতে সামগ্রীকভাবে দেশের সকল মানুষকে নিয়ে চিন্তা ভাবনার কাজ শুরু করুন। সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের সাথে হৃদ্যতা তৈরীতে এগিয়ে আসুন। বিশেষভাবে গবেষণামূলক কাজে নিজেদের শিক্ষিত জনশক্তিতে ব্যাপকভাবে কাজে লাগান। সামগ্রীক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি আরো অনেক বেশি প্রসারিত করুন। নতুবা এত বিশাল জনসমর্থন দিয়েও আসলে তেমন কোন কাজ করা যাবে বলে মনে হয় না।

সমাজ ও রাষ্ট্রে আপনাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরো বেশি শক্তিশালী হোক সেটাই আমরা চাই। আপনাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আরো বেশি উদার হোক সেটাই কামনা করি। দেশের ১০০%মানুষকে সামনে রেখেই আপনাদের সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ভিত্তি তৈরী হোক সেটাই আমরা দেখতে চাই। শুধু দ্বীনদার কিছু মানুষকে নিয়েই চলতে থাকার মানসিকতা যদি আপনাদের থাকে তাহলে কোনদিন রাষ্ট্রীয় শক্তি হিসেবে সফল হতে পারবেন না। জামায়াতে ইসলামীর সাথে আপনাদের আদর্শিক চরমদ্বন্ধ দেখতে পাই। তাদেরকে মোকাবেলা করতে হলে আরো সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা আপনাদের করতে হবে। শুধু মাঠের উপস্থিতি দিয়েই সবকিছু বিবেচনা করলে সেটা হবে রাজনৈতিক বোকামী। আপনাদের জন্য শুভ কামনা।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট ‘বিআইএম’