ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল হঠাৎ কেন ইসলামবিরোধী হয়ে পড়লেন!

প্রকাশিত: 1:32 PM, October 28, 2020

ফ্রান্স যে অস্বাভাবিক একটি সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তার অন্যতম একটি প্রতীক রাজধানী প্যারিসের উত্তর-পূর্বে মুসলিম অধ্যুষিত পাতা এলাকার একটি মসজিদ।

ছোট ছোট জানালাওয়ালা ইস্পাতের ঢেউটিনের তৈরি গুদামের মতো দেখতে এই মসজিদে এখন তালা। খবর বিবিসির।

বাইরে একটি নোটিশ টাঙানো হয়েছে, যাতে লেখা আছে– কট্টর ইসলামী তৎপরতায় লিপ্ত থাকা এবং শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটিকে টার্গেট করে স্যোশাল মিডিয়ায় ভিডিও পোস্ট করার কারণে সরকার এ মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইতিহাসের শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটিকে হত্যা এবং শিরোশ্ছেদ করার প্রতিক্রিয়ায় কট্টর ইসলামের বিরুদ্ধে ফরাসি সরকার ‘দ্রুত ও কঠোর‘ সব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

মসজিদ-সংগঠন বন্ধ, বাড়িতে তল্লাশি চলছে, গাদা গাদা নতুন তদন্ত– এমন আরও নতুন নতুন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা প্রতিদিন যেভাবে শোনা যাচ্ছে যে, তা মনে রাখাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

সরকারের দেয়া হিসাবে ১২০ বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। কট্টর ইসলামী মতবাদ প্রচারের অভিযোগে বেশ কিছু সংগঠন এবং সমিতি বাতিল করা হয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থ জোগানোর রাস্তা বন্ধের কৌশল নেয়া হচ্ছে।

শিক্ষকদের জন্য বাড়তি সাহায্যের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে পোস্ট-ভিডিও-ছবির ওপর নজরদারি বাড়াতে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর শাসনামলে বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলায় ফ্রান্সে পুলিশের সদস্যসহ কমপক্ষে ২০ জন মারা গেছে। কিন্তু তার সরকারের কাছ থেকে এমন তৎপরতা আগে চোখে পড়েনি।

ফরাসি জনমত জরিপ সংস্থা আইএফওপির পরিচালক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেরোম ফোরকোয়া গণমাধ্যমকে বলেন, এবারের হত্যাকাণ্ডটি ছিল ভিন্নতর- একজন শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে এবং অত্যন্ত ‘পাশবিক‘ কায়দায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার মতে, এ কারণেই সরকার এবার অত্যন্ত কঠোর।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখন আর শুধু সংগঠিত জিহাদি নেটওয়ার্কের মোকাবেলা করছি না। আমরা এখন এমন এক সন্ত্রাসীকে দেখলাম, যার কট্টরপন্থায় দীক্ষা এ দেশে বসেই হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার এখন মনে করছে যে শুধু আইনশৃঙ্খলার বেড়ি দিয়ে এই সন্ত্রাসের মোকাবেলা সম্ভব নয়। তাদের এখন সামাজিক নেটওয়ার্ক সামলাতে হবে। কারণ ট্র্যাজিক এ হত্যাকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কীভাবে এসব নেটওয়ার্ক জনগণের মধ্যে ঘৃণার বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। পুরো এ ব্যবস্থাটি বদলাতে হবে।

ফোরকোয়া বলেন, দুবছর আগে তাদের প্রতিষ্ঠানের এক জনমত জরিপে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক বলেছিলেন– ধর্মনিরপেক্ষতার ইস্যুতে সংঘাত এড়াতে তারা ক্লাসরুমে ‘সেলফ-সেন্সরশিপের‘ পথ বেছে নিয়েছেন।

এ বিশ্লেষক মনে করেন, ফ্রান্সের আইনের বিরুদ্ধে এই যে ‘আদর্শিক হুমকি‘ তা মোকাবেলায় এ সরকার যে পথ নিচ্ছে তা সঠিক।
কিন্তু ম্যাক্রোঁর সরকারের এ কৌশল নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে ফ্রান্সে।

ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার পর সায়েন্টিফিক রিসার্চের সমাজবিজ্ঞানী ল্যঁরা মুচ্চেলি মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ‘মাত্রাতিরিক্ত‘ তৎপরতা দেখাচ্ছেন এবং তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তার মতে, ম্যাক্রোঁর মাথায় এখন বিশেষ করে ২০২২ সালের নির্বাচনের কথা ঘুরছে।

তিনি চাইছেন জনগণ যেন মনে না করে যে তিনি ডানপন্থী বা কট্টর ডানপন্থীদের চেয়ে এক পা হলেও পিছিয়ে। তার প্রধান লক্ষ্য ২০২২ সালের নির্বাচন জেতা। উনবিংশ শতাব্দী থেকেই তাদের (কট্টর ডানপন্থীদের) প্রধান টার্গেট অভিবাসন ও নিরাপত্তা।

গত সপ্তাহে একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই ইস্যুতে অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ও অভিবাসীবিদ্বেষী রাজনীতিক মারি ল পেনের ওপর ভরসা করেন। ১৮ মাস পর যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন মারি ল পেন।