লোভে পড়েই সবকিছু ফাঁস করে দেয় রহিম

প্রকাশিত: 9:59 AM, November 12, 2020

সিলেটের বহুল আলোচিত রায়হান হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বরখাস্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে আটকের ‘কৃতিত্ব’ দাবিদার রহিম উদ্দিন লোভে পড়েই সবকিছু ফাঁস করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মূলত ‘পুরস্কারের’ টাকা তার হাতছাড়া হতে পারে- এমন লোভ থেকেই তিনি পুলিশের নির্দেশনার বাইরে চলে গিয়ে ভারত থেকে আকবরকে ধরে নিয়ে আসার তথ্য প্রকাশ করেন।

পাশাপাশি আকবরের সঙ্গে তার ছবি ও ভিডিও ধারণের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিতেও সহায়তা করেন তিনি। কানাইঘাট সীমান্তের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

তারা জানান, এক সপ্তাহ আগ থেকেই রহিমকে কানাইঘাট থানা পুলিশের গাড়িতে চলতে দেখা গেছে। তাকে পুলিশই নিযুক্ত করে আকবরকে ধরতে সহায়তার জন্য।

বিষয়টি স্বীকার করে সিলেটের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, রহিম উদ্দিন ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক বিষয়টি ঘোলাটে করেছে। কয়েকটা ইউটিউব চ্যানেল তাকে উৎসাহিত করায় সে লোভে পড়ে যায়।

তিনি বলেন, আমরা কারও কৃতিত্ব হরণ করিনি। আমরা বলেছি, পুলিশের কিছু বন্ধুর সহযোগিতায় আকবরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সোর্স না বলে সম্মান করে বন্ধু বলেছি। আকবরকে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ায় সীমান্তবর্তী মানুষের অবদান রয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, জনগণ, গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেভাবে বলতে পারে পুলিশ সেভাবে পারে না। আইন ও সীমাবদ্ধতা বজায় রেখে পুলিশকে চলতে হয়, কথা বলতে হয়। আকবরকে ধরে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে সেটাই মুখ্য বিষয়। সিলেটবাসী জেলা পুলিশকে যেন ভুল না বোঝেন সে অনুরোধ করেন তিনি।

পুলিশ ও বিজিবির সোর্স কানাইঘাটের লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের পাত্তিছড়া গ্রামের মৃত তরফ আলীর ছেলে রহিম উদ্দিন গৃহস্থালির পাশাপাশি চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তার স্বজনরা ভারতের শিলচরে থাকায় সেখানে প্রায়ই যাতায়াত করেন তিনি। খাসিয়াদের সঙ্গেও রয়েছে তার সুসম্পর্ক। সেই হিসেবে রহিমকে পুলিশ নিয়োগ করে।

এ জন্য তার পেছনে টাকাও খরচ করা হয়। এমনকি পুলিশের পক্ষ থেকে ভারতীয়দের ১০ লাখ রুপি দেওয়া হয় বলেও গুঞ্জন রয়েছে। যদিও জেলা পুলিশ বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

গত শনিবার রাতে ভারতের করিমগঞ্জের শিলচরে আটক হওয়ার পর আকবরকে রহিমের মাধ্যমেই ডনা সীমান্তে নিয়ে আসা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা একটি ভিডিওতে রহিম উদ্দিনকে ফোনে বলতে শোনা যায়- ‘ওসি স্যাররে কও আমি পাইছি, আমি লগে লগে আছি ওখন’।

কিন্তু ডনা বস্তিতে আকবরকে নিয়ে আসার পর বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তা আপলোড করা হলে পুলিশের গোপনীয়তা রক্ষা হয়নি। কে আকবরকে ধরেছে সে প্রশ্ন সামনে চলে আসে। আকবরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এমন দাবির পর ক্ষোভ প্রকাশ পেতে থাকে।

ডনা সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিক আবুল হোসন সমকালকে জানান, আকবরকে গ্রেপ্তারে রহিম উদ্দিনের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। তাকে পুলিশ নিযুক্ত করেছে। এক লন্ডনপ্রবাসী নাকি ঘোষণা দিয়েছেন আকবরকে ধরতে পারলে ১০ লাখ টাকা দেবেন। রহিম উদ্দিন হয়তো সেই লোভ থেকে আকবরকে ধরে নিয়ে এসেছেন।

এ প্রসঙ্গে রহিম উদ্দিন বলেন, আমি মেঘালয়ে আকবরকে আটক করাই। তাকে লোক দিয়ে ডনা এলাকায় নিয়ে আসি। আমিও সেখানে যাই।

পুলিশকে সব বলেছিলাম। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। কোনো লোভে আকবরকে ধরে তা প্রচার করেননি দাবি করে তিনি বলেন, ডনায় খাসিয়া ও কিছু বাঙালি আকবরের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু :আকবর হোসেন বর্তমানে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেফাজতে রয়েছেন।

তাকে মঙ্গলবার ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, আকবরকে নিয়মানুযায়ী জিজ্ঞসাবাদ চলছে। তাকে নরমাল খাবারও দেওয়া হচ্ছে। দুপুরে মাছ ও ডাল দিয়ে ভাত খেয়েছেন আকবর।

ফাঁড়ির সামনে আলোক প্রজ্ব্বালন :রায়হান আহমদ হত্যার এক মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল ১১ অক্টোবর। গত মাসের এই দিন রাতে তাকে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এক মাস পূর্তিতে গতকাল সন্ধ্যায় সেই ফাঁড়ির সামনে আলোক প্রজ্বালন করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘দুস্কাল প্রতিরোধে আমরা’।

আলোক প্রজ্বালনের আগে সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তারা বলেন, প্রধান অভিযুক্ত এসআই আকবরকে গ্রেপ্তার করায় আমরা পুলিশকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই কোন সিনিয়র অফিসারদের পরামর্শে আকবর পালিয়েছিলেন তা চিহ্নিত করা হোক।

কর্মসূচিতে রায়হানের পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি সিকন্দর আলী, আদিবাসী নেতা গৌরাঙ্গ পাত্র, ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’র আব্দুল করিম কীম, আশরাফুল কবির, দেবাশীষ দেবু, রাজীব রাসেল, দেবব্রত চৌধুরী লিটন, সত্যজিত চক্রবর্তী প্রমুখ।