বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার: সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা

চট্টগ্রামে ইরানের বিখ্যাত পার্সিয়ান সুফি বায়েজিদ বোস্তামী (রহঃ)-এর মাজার শরিফ৷ ১৮৩১ সালে আবিষ্কৃত এই সমাধিস্থলটির নির্মাণশৈলী দেখে ধারণা করা হয় এটি মোঘল শাসনামলে তৈরি৷

বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারে প্রবেশ করতেই দেখা যাবে একটি দীঘি৷ এই দীঘিটি মাজারের মূল স্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ৷ এর পানিকে পবিত্র মনে করা হয় এবং অনেককেই ওজু করার পাশাপাশি বিভিন্ন পাত্রে তা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে দেখা যায়৷

বোস্তামীর কাছিম এই মাজারের অন্যতম আকর্ষণ৷ দরগাহ কমপ্লেক্সের দীঘিতে শতাধিক কালো নরম খোলযুক্ত অত্যন্ত বিরল প্রজাতির কাছিম রয়েছে৷ দর্শনার্থীরা কাছিমগুলোকে রুটি, কলা, মাংসের টুকরা ইত্যাদি খেতে দেন৷ প্রজনন মৌসুমে মাজারের পিছনে নির্দিষ্ট স্থানে এরা ডিম পাড়ে৷

বায়েজিদ বোস্তামী চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ করেননি৷ তবে কথিত আছে, ভক্তদের ভালোবাসা এবং অনুরোধে তিনি তার কনিষ্ঠ আঙুল কেটে কয়েক ফোঁটা রক্ত এখানে ফেলে মাজারের প্রতিরূপ নির্মাণের অনুমতি দিয়ে যান৷ মূল দরগায় রয়েছে মসজিদ, মাজার এবং দীঘি৷

মাজারে যারা আসেন, তাদের প্রায় সবাই মাজার প্রাঙ্গণে মোমবাতি এবং আগরবাতি জ্বালিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান৷

পাহাড়ের উপর মাজারের মূল ভবনের পাশেই রয়েছে একটি গাছ৷ দর্শনার্থীরা তাদের মনের বিশেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য এই গাছে সুতা বেঁধে থাকেন এবং ইচ্ছাটি পূরণ হলে পুনরায় এখানে এসে সুতাটি খুলে ফেলেন৷

মাজারে প্রবেশ করতে কিছুদূর পরপর বিভিন্ন বয়সি ভিক্ষুক এবং সন্ন্যাসীদের হাত পেতে অর্থ-সাহায্য চাইতে দেখা যায়৷ অনেক দর্শনার্থীই বিষয়টি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন৷

মাজারের মূল কক্ষে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নেই৷ বাইরে থেকেই তারা মাজার দর্শন করে থাকেন৷ মহিলারা যেন আলাদাভাবে নামাজ পড়তে এবং মাজারে অবস্থান করতে পারেন, সেজন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা আছ।

মাজার প্রাঙ্গণে বেশ কয়েকটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা৷ চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই মাজারে দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন৷ যাতায়াতের সুবিধার জন্য তাই অনেকেই গাড়ি বা অটোরিক্সা ভাড়া করে নিয়ে আসেন৷

মায়ের সাথে মাজারে এসেছে সাত মাস বয়সি রেদোয়ান৷ বাচ্চাটির সুস্থতার জন্য মাজারের একজন খাদেম ময়ূরের পালক দিয়ে তার সারা শরীর ঝেড়ে দিচ্ছেন৷

উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী মারুফ আবির প্রতি শুক্রবার মাজারে আসেন পারিবারিক কবর জিয়ারত করতে৷ মাজারের মূল প্রাঙ্গণের পাদদেশে অবস্থিত কবরগুলো কত বছর আগের জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো শতাধিক বছরের পুরনো৷ তিনি জানান, এখানে আর নতুন করে কাউকে কবর দেওয়া হয় না৷

শ্রী ফুলেশ্বরী মাজারে এসেছেন মুরাদপুর থেকে৷ এক বছর আগে তিনি মাজারে এসে প্রার্থনা করেছিলেন তার ছেলের যেনো দ্রুত বিয়ে হয়৷ তিন মাস আগে ছেলের বিয়ে হওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে আবার এখানে এসেছেন৷ অন্য ধর্মানুসারী হয়েও এখানে কেন এসেছেন- এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘এই মাজার সবার, এখানে ধর্ম বা জাতপাতের কোনো ভেদাভেদ নেই৷’’

মাজারে বিভিন্ন নিয়তে আসা দর্শনার্থীরা পয়সাকড়ি দানের পাশাপাশি ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি পশুও দান করে থাকেন৷ মাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, এগুলো পরে বিভিন্ন উপলক্ষে রান্না করে গরীব দুঃখীদের খাওয়ানো হয়৷

অক্সিজেন মোড় থেকে ইরফান মাজারে এসেছে মা আর ৫ মাস বয়সি ভাই আয়মানকে নিয়ে৷ কারণ, জিজ্ঞেস করায় জানালো, ছোট ভাইয়ের মুখে প্রথমবারের মতো মাজারের মিষ্টিজাতীয় খাবার দেওয়ার জন্য এসেছে তারা৷