যেভাবে কাটছে জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা’র শিক্ষার্থীদের হোম কোয়ারেন্টিনে!

প্রকাশিত: 4:25 AM, April 26, 2020

বিশ্বব্যাপী এক ভয়ঙ্কর আতংকের নাম ‘করোনা ভাইরাস’। দিন দিন বিস্তার বাড়ছে। বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিচ্ছেন দৈনিক হাজারো মানুষ। স্বাস্থ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪,৯৯৮ এবং মৃতের সংখ্যা ১৪০ জন। প্রায় এক মাসেরও আগে করোনা প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহ বিস্তার গোচরে আসার পর পর দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।

এই দীর্ঘ সময় একাডেমিক পড়াশোনা থেকে দূরে থেকে ছুটির দিনগুলো কীভাবে কাটাচ্ছেন জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা’র শিক্ষার্থীরা বন্ধুরা, কায়েজনের সাথে আলাপচারিতার পর একটা গড় চিত্র ফুটে ওঠেছে। চলুন, দেখে নেওয়া যাক- শিক্ষার্থীদের কে কীভাবে লকডাউন পরিস্থিতিতে সময় পার করছেন।

জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা’র দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পরিক্ষার্থী মুহা. রফিকুল ইসলাম জানান, মহামারির সমসাময়িক চরিত্র যুদ্ধক্ষেত্রের জীবনযাপনের মতোই। এমনকি তার চেয়েও কঠিনতম হিসেবেই যেন প্রকাশ পাচ্ছে। পুরো দুনিয়াকে করে দিয়েছে অচল।

ছন্দে চলা জীবনে যখন দ্রুত গতিতে এগুচ্ছি, তখন হঠাৎ করেই থামতে হলো। করোনা ইস্যুতে ক্যাম্পাস ছুটি হয়েছে দীর্ঘদিন আগেই। সবাই বাড়িতে চলে গিয়েছে যার যার মতো করে। পরিবারের সাথেই ছুটি কাটাচ্ছেন সবাই। তবে আমার হোম কোয়ারেন্টাইন একটু ব্যতিক্রম। আমার হোম কোয়ারেন্টাইন কাটছে প্রাণের ক্যাম্পাসেই। কে ভেবেছিলো ছুটি এতো দীর্ঘ হবে?

আমার ছুটি, হোম কোয়ারান্টাইনের এই দিনগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তেমন হচ্ছে না। নিয়মিত নামাজ পড়ছি, কুরআন তিলাওয়াত করছি, স্রষ্টাকে বেশি বেশি স্মরণ, প্রার্থনা এবং নানাবিধ ধর্মীয় কাজেই বেশির ভাগ সময় কাটছে। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ফোন ও ফেসবুকে করোনা রোধে সচেতনতা নিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।

তবে ছুটিতে ফ্রি থাকার কথা থাকলেও কেন জানি ফ্রি অনুভব করতে পারছি না; মানসিক চাপ বড্ড বেশি। পরীক্ষা তো সামনেই। করোনার সময়ে করোনার থেকে পরিক্ষার টেনশন কাজ করছে বেশি। কারণ, একাডেমিক ভাবে এটাই আমার লাইফের শেষ পরিক্ষা। তাই রবের কাছে চাওয়া পাওয়াটা একটু বেশিই। এই পরিস্থিতিতে পড়াশোনার মনমানসিকতা একদম নেই। ইবাদত-বন্দেগীর বাইরের সময়টা বেশিরভাগ ঘুমের মধ্য দিয়েই কাটে, পড়াশোনা তেমন হয় না।

এই পড়ি! সেই পড়ি! এসব মিথ্যে বুলি ছড়িয়ে নিজেকে মহাজ্ঞানী প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করে কি লাভ! তবে আলহামদুলিল্লাহ আমার শায়েখ জাতির রাহবার বাংলার মাদানি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (হাফি.)এর সংস্পর্শে থাকার কারণে মাঝে মাঝে কিছুটা মুতায়ালা হচ্ছে। উস্তাদে মুহতারাম বলেন, তালিবে ইলেম সর্বদা মুতাআলায় ডুবে থাকবে, সর্বদায় পরিক্ষার জন্যে প্রস্তুত থাকবে।

হুজুরের নির্দেশনায় দরসী কিতাবের বাইরে অন্যান্য কিতাবাদিও মুতাআলায় সময় বাড়াতে চেষ্টা করছি। পার্বত্য চট্রগ্রাম তথ্যকোষ ১০ খন্ড, আচ্ছারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসুল অন্যতম। সাথে সাথে আত্মার খোরাকও মিলছে শায়েখ থেকে। সর্বশেষ বর্তমান সময়ের অনুভূতিতে একটা কথাই বারবার মনে আসছে-
করোনা বিলুপ্ত হোক। থামুক মৃত্যুর মিছিল।

এই সুন্দর, নির্মল ভোরের লাল সূর্যটি আবার উঠুক। যার আলোয় আলোকিত হবে বিশ্ব। স্বস্তির হাসি হাসবে সবাই, বাংলার প্রতিটি মানুষ আবার কাজে ফিরবে, দেশের উন্নয়নের চাকা চালু হবে সর্বোচ্চ গতিতে।

সবার জীবনের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে উপরওয়ালার কাছে একটি সুস্থ-সুন্দর বিশুদ্ধ বাতাসে ভরা পৃথিবীর প্রার্থনা করি সবসময়।

সেই ভোরের অপেক্ষায় দিন গুনছি। যেদিন ঘুম ভেঙে উঠে শুনবো- পৃথিবীটা সুস্থ আছে, আল্লাহ’র রহমত বর্ষন হচ্ছে, করোনার ঝড় থেমে গেছে। তাই নিজেকে, স্বপ্নকে, সমাজকে, দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে সবাই সচেতন হয়ে উঠুন। আল্লাহ একমাত্র তাওফীক দাতা।

মুহা. নূর হোসাইন সবুজ

জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার ফযীলত দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছাত্র জমিয়ত ক্যাম্পাস শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহা. নূর হোসাইন সবুজ জানান, প্রায় একমাসেরও বেশী সময় আমরা ঘরবন্দী। বন্দী জীবনটা বোরিং হলেও আমার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক। ক্যাম্পাসে তো প্রায় তেইশ ঘন্টাই একধরনের লকডাউনে ছিলাম। লকডাউনের বাইরে যে এক ঘন্টা সময় পেয়েছি, সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রায়ই সেই সময়টুকুতে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে চায়ের আড্ডায় ভীড় জমিয়েছি।

কিন্তু করোনা লকডাউনের এই সময়ে প্রিয় উস্তাদদের খুব মিস করছি। প্রিয় উস্তাদদের স্নেহ আর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি বললে ভুল হবে। নিয়মিতই প্রাণপ্রিয় উস্তাদদের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। অনলাইনে তাদের লেখা কলামগুলো নিয়মিত পড়ছি। তাদের লেখাগুলো পড়ে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দ্বিগুণ হচ্ছে। জাতীর এই দুঃসময়ে তাদের একেকটা কলাম মানুষের জীবন চলার পাথেয়।

এই বিপর্যস্ত সময়ে কিছুদিন আগেও ছাত্র জমিয়ত ঢাকা মহানগরীর ব্যানারে সাধ্যানুযায়ী গরীব অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছি। আল্লাহ তৌফিক দিলে রমজানেও অসহায় মানুষের পাশে থাকার ইচ্ছা আছে, ইনশাআল্লাহ।

রমজানের সময়টাতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতেই ব্যাস্ত থাকার ইচ্ছা। কারণ, আমার শায়খ আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (হাফি.) বলেন, রমজানে শুধুই কালামুল্লাহ’র তেলাওয়াত। ব্যাক্তিগত আমল অন্য সময়ে করা যাবে। হুজুরের এই নছিহতটা সব ধরনের মানুষের জন্য।

ছোট্ট বোনটাকে কতবার বললাম এখানেই থেকে যা। এত করে বলার পরেও চলে গেলো শ্বশুর বাড়ী! অনেক মায়া হয় বোনটার জন্য। মনে হয় ঘরটাতে কি যেন নেই। ঘরটা এলোমেলো, অগোছালো। বোনটা প্রতিদিনই ফোন দিয়ে খবর নেয়। কিন্তু আমিই কেমন জানি! একবারও নিজের থেকে ফোন দেই না। মাঝে মাঝে আম্মুর জন্যই ফোন দেয়া হয়!

ওই দিন তো এক বিস্ময়কর কান্ড ঘটে গেলো। পাশের বাসার আন্টি এসে কলিংবিলে চাপ দিলেন। লুকিং গ্লাসে দেখে আমি আর সামনে এগুলাম না। আম্মু দরজা খুলতেই, হুড়মুড় করে ভীতরে ঢুকে পড়তে চাইলেন। আমি দূর থেকেই বারণ করলাম। ৩ ফিট দুরত্ব বজায় রাখতে বললাম। আন্টি হয়তো সাময়িক কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের একটু সচেতনতা আবার সেই সোনালী দিনগুলো ফিরে আসবে। যদিও রোগব্যাধি একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই দিয়ে থাকেন। আল্লাহর তরফ থেকে করোনা আক্রান্ত হওয়ার প্লানে যার নাম থাকবে, তিনি যে কোনভাবেই সংক্রমিত হবেনই। কিন্তু তবুও আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও তাকদীরে বিশ্বাসের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতাকে অবজ্ঞা করতে ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে।

পরিশেষে মহান রবের দরবারে ফরিয়াদ জানাই-

হে প্রভু!
তোমার মিনার থেকে ভেসে আসছে হাইয়্যা আলাস সালাহ…!
একবার ক্ষমা করো প্রভু, ছেড়ে দিবো সব গুনাহ্….!
দুঃখ! হাটে-বাজারে লোকে-লোকারণ্য।
আর মসজিদে যেতে মানা!
পাপের বোঝা মাপা যাচ্ছে না ওজন-পাল্লায়,
হালকা হবে বোঝা প্রভু শুধু তোমারই দয়ায়!
অসহায় মোরা সহায়-সম্বলহীন,
তুমি একমাত্র আমাদের শ্রেষ্ঠ আমীন।
কারণ, তোমার মালিকানাধীন পুরাটা জমীন।

’মাহমুদ হাসান নাহিয়ান

জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার মুতাওয়াসসিতাহ্ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমূদ হাসান নাহিয়ান জানান, তখন জামিয়ার সালানা ইমতিহান শুরু হল মাত্র। হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সরকারি ঘোষণায় পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে তোলপাড়। প্রথম প্রথম গুজব মনে হলেও স্বপ্ন স্বাধ ভেঙ্গে একসময় সত্যিই মাদ্রাসা বন্ধের ঘোষণা দিয়ে দিলেন আমাদের বড় হুজুর।

হায়, একি হলো! এ যে সারাবছর কৃষকের ঘামঝরা ফসল ঘরে তোলার আগে বন্যায় তলিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো দুর্যোগ! বাসায় এসে তো মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা। দু’ মাস লম্বা ছুটি! অন্যান্য বছরের এই সময়টা একমাস ছুটি থাকে এবং সে সময়টা রমজানের প্রস্তুতিতেই কেটে যায়। আমাদের বড় হুজুর নসিহতে বার বার একটি কথা বলতেন- ‘বেটারা সময়ের কদর করো’। তাই এই লম্বা সময়টা নষ্ট করা মোটেই ঠিক হবে না। অনেক ভেবে চিন্তে ছুটির সময়টাকে দু’ ভাগে ভাগ করলাম। দ্বিতীয় ভাগে রমজানের প্রস্তুতি এবং প্রথমভাগে কিতাবের যেসব জায়গা আয়ত্বে দূর্বলতা অনুভব করছি, সেগুলো দূর করার জন্য।

প্রথম দিকে আমি দিনকে চার ভাগে ভাগ করে নিলাম। সকালে কুরআন তিলাওয়াত। দুপুরে আরবি সাহিত্য। সন্ধ্যায় নাহু-সরফ তথা আরবী গ্রামারশাস্ত্র এবং রাতে ফিক্বাহশাস্ত্র। আর বাকি সময়টা পাবারিক কাজে সহযোগিতা করা। তবে পবিত্র রমজান ঘনিয়ে আসতেই আমিও যেনো একরোখা হয়ে গেলাম। শুধুমাত্র কুরআনে কারিমের পিছনেই মেহনত চলতে লাগলো। আর এই লম্বা সময়টা এত সুন্দর ভাবে কাজে লাগাতে পেরেছি, সেটা এক যোগ্য পিতার কল্যাণেই। জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার সম্মানিত নায়েবে মুহতামিম আমার মুহতারাম আব্বাজান আল্লামা হাফেজ নাজমুল হাসান কাসেমী (দামাত বারাকাতুহুম) আমারই লম্বা সময়টা নিখুঁত সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। মুহতারাম আব্বাজানের নেক নজর না থাকলে হয়তোবা এই সম্পূর্ণ সময়টা বেকার যেত। আল্লাহ তায়ালা হযরতের ছায়াকে আমাদের ওপর বরকতম করুন এবং হযরতের নেক হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমিন।

মুর্তজা হাসান ইবনে হেদায়েত

জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার ‘সানাবিয়া উলইয়া’র (উচ্চ মাধ্যমিক) শিক্ষার্থী মুর্তজা হাসান ইবনে হেদায়েত জানান, ভয়াবহ করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে পুরো পৃথিবী আজ স্তব্ধ। চারিদিকে বনি আদমের হাহাকার। থমকে রয়েছে শহর-বন্দর, রাজপথ ও চলাচলের যানবাহন। মানবগোষ্ঠীর মাঝে হায় হুতাশ বিরাজমান। সমাজে কান্নার রোল জমে উঠেছে। বিশ্ব মুসলিম গভীরভাবে ইসলামের প্রতি ঝুঁকছেন। পৃথিবীটা যেনো আগের মতো নেই। সে আজ অনেক অসুস্থ। আর সেই অসুখের নাম হচ্ছে করোনা ভাইরাস।

করোনা হচ্ছে তুফান, ঝড়, বন্যার মতো এক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি মুহূর্তে আচরণ বদলাচ্ছে এই রোগটি। ফলে ভ্যাকসিন তৈরী করার সময় চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে বিজ্ঞানীদের। এই দুর্যোগ বাংলাদেশেও প্রভাব বিস্তার করেছে। দিন কি দিন এর ব্যাপকতা বেড়েই চলছে। ফলে শহর, বন্দর, সমস্ত দেশে লকডাউন পরিস্থিতি চলছে।

স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, মসজিদ-মাদ্রাসা, অফিস-আদালত সবকিছুই বন্ধ। সরকার, এমপি-মন্ত্রী, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ সবশ্রেণীর লোক ঘরে আবদ্ধ।

প্রথম যখন করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে আসতে শুরু করে, তখনও মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করা হতো। কিন্তু আজ আমি ঘরেই নামায পড়তে বাধ্য। শিক্ষা জীবনের এই বছরে (২০১৯-২০) তেমন খেলাধুলা-ঘুরাঘুরি করিনি। কারণ, বোর্ডের পরীক্ষা এই বছরটা আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এখন নিয়মিতই বাসার পাশের মাঠে ক্রিকেট খেলছি।  ক্যাম্পাসে থাকাকালীন দরসী বই ছাড়া অন্যান্য বই পুস্তক পড়া হতো না। কিন্তু এখন নিয়মিতই বই পড়া হচ্ছে। এই অবসরে নিয়মিত পাঁচ থেকে সাত পারা কুরআন শরীফ দৈনিক তিলাওয়াত করতে পারছি। বাসার ছাদের মরিচ, পেঁপে, সাজনা ইত্যাদি গাছগুলোর পরিচর্যা করছি। যা আগে কখনো হয়ে উঠেনি। আম্মুর সাথে বাসার কাজে সহযোগীতা করতে পারছি; যেমন- রুটি ছ্যাঁকা, ফার্নিচার মোছা, কাঁচের আসবাবপত্র পরিষ্কার করা ইত্যাদি।

করোনার ভয়াল থাবা বিস্তারের এই আতঙ্কজনক দিনগুলোতে দরিদ্র, অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করাটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের। যেই আনন্দ আমি অন্য কোন কিছুর মাঝে খুঁজে পাইনি। রোজ বিকেলে ছাদে ঘুড়ি উড়ানোটা বেশ উপভোগ্য, যা আমাকে শৈশবের দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মাদ্রাসায় থাকাকালে তেমন সাহিত্য চর্চা হতো না, আর এখন সময় কাটাতে কিছু না কিছু লেখালেখি করতে পারছি।

মোটকথা, এই আতঙ্কের মাঝে আমার দিনকাল এক রকম ভালোই কাটছে। সর্বপরি কথা হলো- এই করোনা ভাইরাস আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি গজব মাত্র। তিনি মুমিনদেরকে এই মহামারী দিয়ে পরীক্ষা করছেন। কাজেই আমাদের করোনাকে ভয় পেলে চলবে না। মৃত্যু তো আমাদের একদিন হবেই।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- প্রতিটি জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের সঙ্কটময় সময়গুলোতে আমাদের বেশি বেশি ইবাদত, বন্দেগী, নামাজ, রোযা করতে হবে; যাতে আল্লাহ তায়ালা এই মহামারীকে জমিন থেকে উঠিয়ে নেন। আল্লাহ কুরআন মাজীদে আরো বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা সকলকে ধৈর্য্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন। সাথে সাথে এই আযাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমিন।

মুহা. শাহাদাত আবির

জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার সানাবিয়া উলইয়ার আরেক শিক্ষার্থী মুহা. শাহাদাত আবির জানান, করোনাভাইরাস এক আতঙ্কের নাম। এই ভাইরাসের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ব। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। এই ভাইরাসের জন্য সরকার বন্ধ ঘোষণা করেছে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর আমাদের প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাস জামিয়া মাদানিয়া বারিধারাও অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি দিয়েছে। কবে খুলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই সংকটকালীন সময়গুলো কীভাবে কাটছে; প্রশ্নের এক কথায় উত্তর হল, চরম একঘেঁয়েমিতে কাটছে।

বন্ধু-বান্ধব সে যেন ছাত্র জীবনের এক মহামূল্যবান উপহার। যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি জীবনের কার্যক্রম দ্বারা অর্জন করা হয়। করোনার কারণে এখন আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। জীবনে প্রথম বারের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীদের অভাব বুঝতে পারছি। আজ জীবন থেমে গেছে, নেই তার কোন রস, নেই কোন আনন্দ, নেই কোন আবেগ, নেই কোন আড্ডা, হারিয়ে গেছে সে প্রেম।  আর পাওয়া যায় না টঙের দোকানে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া। আজ মন বিষণ্ন। মনে নেই কোন আবেগ, যেন হারিয়ে ফেলেছে তার চিরচেনা রুপ। সব কিছু আজ শুধুই বোকা বাক্সে বন্দি। ছাত্র জীবনে পারিবারিক টানে সামান্য সময়ের জন্য, কিছুদিন গেলেই ক্যাম্পাস আর বন্ধুদের জন্য মন কাঁদে। ফিরে যেতে মনে চায় সেই কারখানায়, যেটা আমাদের প্রস্তুত করছে আগামীর জন্য। রাত দিন ছোটাছুটি, ক্লাস, পরিক্ষা, আড্ডাবাজি, ঘোরাঘুরি, একসাথে খাওয়া-দাওয়াই তখন ছিল প্রতিদিনের রুটিন। আর আজ রাতের আঁধারের মত অদৃশ্য এক ঘন কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে গেছে তার রুপ, তার কোলাহল। আজ করোনার অতঙ্কে আমরা আতঙ্কিত, জীবনকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আজ আমরা গৃহবন্দী। আর বন্ধুদের সাথে ভালো মন্দ খোঁজ রাখার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। যা ব্যবহার করেই কাটছে এই দিন।

পরম করুণাময়ে দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন দ্রুত এই মহামারির প্রাদুর্ভাব থেকে জাতিকে উদ্ধার করেন এবং আবার যেন সব কিছু কোলাহল মুখর হয়ে ওঠে। আমীন।