অনিয়মে অভিযুক্ত বেফাককর্তাদের শাস্তি চান তরুণ আলেমরা

প্রকাশিত: 10:50 PM, July 22, 2020

বেফাকের ভয়াবহ দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পর তরুণ আলেমরা যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে সিনিয়র ও মধ্যম সারির আলেমরা দফায় দফায় বৈঠক করে এর সামাধান খুঁজছেন। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এমতাবস্থায় চলমান ইস্যুতে চিন্তাশীল তরুণরা তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা স্থানে।

তরুণ আলেম মুফতি ইউসুফ সুলতান বলেন, সম্প্রতি একাধিক ফোনালাপ ও ডকুমেন্ট ফাঁস হয়েছে। যা বোর্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির প্রমাণ বহন করে। এই বোর্ডের একজন শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে অন্য সবার মতো আমিও এতে বেশ মর্মাহত। এমতাবস্থায় এ ব্যাপারে আমার অভিমত হলো-

১. সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা, ২. ফাইন্যান্সিয়াল অডিট, ৩. অডিট ও তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ এবং ৪. প্রমাণিত দুর্নীতিপরায়ণদের দায়িত্ব থেকে বরখাস্তসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
তিনি আরও বলেন, নেতৃত্ব ও দায়িত্বের অপরিহার্য গুণ দুটি। ১. কুওয়াহ, অর্থাৎ শারীরিক, মানসিক ও জ্ঞানগতভাবে কার্যসম্পাদনে সক্ষম হওয়া। ২. আমানা অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি, সম্পদ ও যাবতীয় দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার স্বাক্ষর রাখা।

বেফাকের নিজস্ব তদন্তেও বেশকিছু অনিয়ম ধরা পড়ে

তরুণ এই আলেম বলেন, আর্থিক লেনদেন হবে অপরিচিতের ন্যায়। এখানে বাহ্যিক বেশভূষা, ব্যক্তিগত কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক অথবা কোনো রকম আবেগের স্থান নেই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাজের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। দুর্নীতি দেখে চুপ থাকা বা মৌন সমর্থন দেওয়া দুর্নীতি করার পর্যায়েই। মনে রাখতে হবে, আমরা কেউই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নই।

একাধিক তরুণ আলেমের সঙ্গে কথা বলে বেফাক নিয়ে তাদের ক্ষোভ বোঝা গেছে। তাদের দাবি, বেফাককে ঢেলে সাজানো হোক। শিক্ষাবোর্ডের দায়িত্বশীলগণ হবেন কর্মকর্তা। তারা হবেন- সৎ, যোগ্য ও পরিশ্রমী। তারা ন্যায়-নীতির আলোকে কাজ করবেন। এখানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা কেন?

উত্তরা জামিয়া ফারুকিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা শোয়াইব বলেন, ‘অভিযোগ যখন উঠেছে, প্রমাণও উপস্থিত। সুতরাং অভিযুক্তদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি ভালো লক্ষণ নয়, এটা আরও নতুন অন্যায়ের জন্ম দেবে।

বেফাকের চলমান সমস্যা সমাধানের পথ

মাদানীনগর মাদরাসার উস্তাদ মাওলানা ফয়সাল আহমাদ বলেছেন, বর্তমানে মজলিসে আমেলা, শুরা এবং খাস কমিটির বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের নিয়মিত রাহ খরচ দেওয়া হয়। বেফাকের দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে প্রথমে বিভিন্ন বৈঠকের নামে রাহ খরচ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে যারা নিজের অর্থে বিভিন্ন মজলিসে হাজির হয়ে বেফাকের কাজ করতে প্রস্তুত, কেবল তাদের দ্বারা কমিটি গঠন করতে হবে।

বেফাক গঠনকালীন সময়ে যাদের দ্বারা বিরোধিতা প্রমাণিত, তাদেরকে কোনো প্রশাসনিক পদ দেওয়া যাবে না। বেফাকের গঠনতন্ত্রে সভাপতি নিজ ক্ষমতাবলে কয়েকজনকে কো-অপ্ট করার পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। বেফাকের বিভিন্ন পদে থেকে যারা অনিয়ম করেছেন- তাদেরকে কমিটি থেকে বাদ দিতে হবে।

মতিঝিল জামিয়া তাকওয়ার শিক্ষক মাওলানা আবদুল বাতেন বলেন, বেফাক একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এটা নিয়ে আমার গর্ব করি। কিন্তু কিছু অর্থলোভী ও পদলোভীদের কারণে এটা আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। একজন কয়েক পদ দখল করে আছেন। সাব-কমিটিতে ঘুরে ফিরে তারাই। বেফাকের তহবিল থেকে এমনসব খাতে খরচ করা হচ্ছে, যা বলতেও লজ্জা লাগে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেফাকের কমিটি এখন আর কাউন্সিলের মাধ্যমে হয় না। রাতের আঁধারে খসড়া করে, সকালে শুধু শুনিয়ে দেওয়া হয়। কমিটিতে প্রভাবশালীদের পরিবার-পরিজনের সংখ্যাই বেশি।

বেফাকের জটিলতা নিরসনের গঠনতান্ত্রিক উপায়

সাম্প্রতিক সময়ে ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপের সূত্র ধরে তিনি বলেন, পরীক্ষা শুরুর আগেই যদি ছক তৈরি হয়, এ বছর মেধাতালিকায় কারা কারা থাকবে, তাহলে কী দরকার পরীক্ষা নেওয়ার? এটা তো ধোঁকা, প্রতারণা। এসব চলতে পারে না।

মিরপুরের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, একাধিক ফোন রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর অভিযুক্তদের আর এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, তিনি নির্দোষ। বরং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা না পর্যন্ত স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়া উচিত অভিযুক্তদের। অতঃপর নিরপেক্ষ তদন্তে নির্দোষ প্রমাণ হলে, পুণরায় দায়িত্ব নেবেন। তাতে তাদের সম্মান আরও বাড়বে।

বয়োজ্যেষ্ঠ আলেমদের এগিয়ে আসতে হবে
বেফাকের চলমান অস্থিরতা নিরসনে বয়োজ্যেষ্ঠ আলেমদের এগিয়ে আসতে হবে। বেফাকের মূল গঠনতন্ত্র যা মাওলানা আব্দুল জব্বার রহ. ও মাওলানা আবুল ফাতাহ্ ইয়াহয়া রহ.-এর সময় থেকে ছাপানো আছে সেটা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করে বেফাক পরিচালনা করতে হবে। স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরাচারী কায়দায় এবং নৈতিক স্খলনের শিকার কাউকে নেতৃত্বে দেখতে চায় না- তরুণ আলেমরা। তরুণ আলেমদের প্রত্যাশা, বেফাকে প্রয়োজনীয় সংস্কার হোক। কওমি শিক্ষাধারা আরও উন্নত, শক্তিশালী, ও আধুনিক হোক। প্রবীণদের পাশাপাশি মধ্যবয়স্ক যোগ্য আলেমদের নেতৃত্বে আনা হোক।

মোহাম্মদপুরের মাওলানা সালেহ আহমদ বলেন, এ দেশের কওমি মাদরাসাগুলো শতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সততা, নীতি-নৈতিকতা ও আস্থার বিশ্বস্ত ঠিকানা। সে জায়গাগুলো কতিপয় দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য, অক্ষম, অসৎ, অসাধু, খেয়ানতকারীদের কারণে অনাস্থার দূর্গে পরিণত হতে চলেছে। এটা মানা যায় না। কল্যাণকামী গঠনমূলক সমালোচনাকারীদের মুখ সাময়িকভাবে বন্ধ করা গেলেও নিজেদের অপরাধ কখনও ঢেকে রাখা যায় না। বরং স্বার্থান্বেষীদের প্রলয় আরও তরান্বিত হয়। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। সূত্র: বার্তা২৪ডটকম