বেফাক-হাইয়াহকে বিলুপ্ত করে দেয়া সময়ের দাবী!

প্রকাশিত: 1:48 PM, August 7, 2020

স্বাধীনতা পরবর্তি বাংলাদেশের কওমী মাদরাসাগুলোকে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে একিভূত করার জন্য ১৯৭৮ ঈসাব্দের ২৩ এপ্রিল ঢাকার শায়েস্তা খান হলে গঠিত হয় বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ বা বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড।

একটি শিক্ষাবোর্ড হিসেবে এর মৌলিক লক্ষ-উদ্দেশ্য ছিলো দরসে নেযামীর অবকাঠামোগত মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে যুগচাহিদার আলোকে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করত: পাঠ্যকারিকুলাম পরিচালনা করা। যথাসম্ভব সারাদেশে অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদান কর্ম সম্পাদন করা। মৌলিক কার্যক্রমের মধ্যে ছিলো বিভিন্ন স্তরে ও মারহালায় কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মাধ্যমে সারাদেশে প্রতিযোগিতা মূলক পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করে সুপ্ত মেধার বিকাশ ঘটানো।

সে লক্ষে চার দশকের অধীক সময় পার করে অঙ্কুর থেকে আজ একটি বিশাল বটবৃক্ষ। চল্লিশোর্ধ সময়ে বেফাকের অর্জন-উপার্জনের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ।

কিন্তু এর পাশাপাশি আমার দৃষ্টিতে বেশকিছু অপূরনীয় ক্ষতি আমাদের কওমী শিক্ষা ব্যাবস্থার এবং মাদরাসাগুলোর হয়েছে,যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যেমন-

এক.

সংযোজনের তুলনায় বিয়োজন বেশি হয়েছে। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদি কিতাব হতে ছাত্রা বঞ্চিত। উলূমে আকলিয়াহ্কে প্রায় সম্পূর্ণই বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে,অথচ উলূমে আকলিয়ার দ্বারা ছাত্রদের বুঝশক্তি শানিত হয়।

দুই.
প্রশ্নপত্র তৈরী,খাতা বন্টন,খাতা যাচাই,ফলাফল প্রস্তুত ইত্যাদি পুরো পরীক্ষা ব্যাবস্থাপনায় অনিয়ম,অনৈতিকতা, দূর্নীতি,জালিয়াতি ইত্যাতির কারনে শিক্ষাবোর্ডের মৌলিক অবস্থানই হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে কেন পরীক্ষা গ্রহন ভিত্তিক এই শিক্ষাবোর্ড?

তিন.
একটি জাতিয় শিক্ষাবোর্ড হিসেবে যেখানে তার পরিচালনা পদ্ধতি হওয়া দরকার ছিলো সর্বোচ্চ নিরপেক্ষ, সেখানে বোর্ডে গড়ে উঠেছে মুষ্টিমেয় কয়েকটি মাদরাসা ও ব্যক্তিবর্গের বলয়ভিত্তিক সিণ্ডিকেট। ফলে এর বাইরের মাদরাসাগুলো বরাবরই সঠিক ফলাফল পেতে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে।

চার.
কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ঘুরেফিরে কাছাকাছি ধরনের প্রশ্ন হওয়ার কারনে প্রথমে কেবল প্রশ্নপত্র ভলিয়ম সংকলন,এরপর সংক্ষিপ্ত নোট হয়ে এখন সরাসরি রকমারি গাইডের বাহার চলছে। ফলে এখনকার ছাত্রদের কিতাবের সাথে কোনভাবেই সম্পর্ক তৈরী হচ্ছেনা। এমনকি ইবতিদায়ীর ছাত্ররা উরদূ এবং ফারসীর জন্য নোট-গাইডের প্রতি মুহতাজ। শুরু থেকেই এই অভ্যাসে অভ্যস্ত।

পাঁচ.
বোর্ডের কারনে কওমী মাদরাসার শত বছরের ঐতিহ্য তথা স্বকীয়তা-স্বাধীনতা ভেঙ্গে চুরমার করে সরকারী হস্তক্ষেপ ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে।

ছয়.কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যাবস্থার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে রেযায়ে মাওলা এবং হেফাজতে কুরআন ও সুন্নাহ। সেমতে এ শিক্ষা ব্যাবস্থার জন্য কোন ধরনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মানের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। কিন্তু আমাদের কতিপয় বড়রা সস্তা দামে শহস্রাধীক বছরের ঐতিহ্যকে বিকিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করলেননা। দারুল উলূম দেওবন্দের আদলে স্বীকৃতি নেওয়ার শ্লোগান তুলে বাঙ্গালী জাতির সাথে এক ঐতিহাসিক প্রতারণা করলেন। কারন- দারুল উলূম দেওবন্দ আজো কখনো কোন ধরনের স্বীকৃতির জন্য কোন আওয়াজ উত্থাপন করেনি। দারুল উলূম দেওবন্দের আদলে স্বীকতির এলহামী শ্লোগান শতাব্দীর সবচে’ নির্জলা ডাহামিথ্যা কথা। যার অশুভ ফলাফল ইতোমধ্যে আমার সামনে প্রকাশ পাওয়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।

সাত.
স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে স্বীকৃতি বাস্তবায়ন হচ্ছে ইজতেমায়ে জিদ্দাইন। সরকারী স্বীকৃতিও থাকবে আবার স্বকীয়তাও থাকবে – এটা হচ্ছে বোকার স্বর্গে বাস করার মতো। এই বাস্তবতা এখন কাওকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বোঝাবার দরকার নেই।

আট.
পরামর্শ ভিত্তিক শুরাঈ নেযাম লণ্ডভণ্ড হয়ে ব্যক্তি বিশেষের হাতে এমন ভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীন পরামর্শক্রমে হবেতো দূরের কথা সাধারাণ মিটিং এর স্থান ও তারিখ পর্যন্ত চিঠি মারফত উড়ে আসার সংস্কৃতি চালু হয়ে গিয়েছে।

অতএব,আর নয়। দেওবন্দী চিন্তাধারার কওমী মাদরাসারগুলোর যা ক্ষতি হবার যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামুন। আগের জায়গায় ফিরে আসুন। দেওবন্দী নেযামে এবং কওমী মাদরাসার মূলধারায় মাদরাসাগুলো পূন:বিন্যস্ত করুন।

মুফতী মামুন আব্দুল্লাহ কাসেমী

মুহাদ্দিস জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া মোহাম্মদপুর ঢাকা