আহসান শেখ : গত ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। এ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সফরে বিশ্বের অধিকাংশ দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানগণ উপস্থিত হন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান,ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল আলিমী এবং সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা জাতিসংঘ অধিবেশনে নিউইয়র্কে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং সেখানে তারা ভাষণ দেন। তাদের ভাষণগুলোতে উল্লেখিত চার দেশের বর্তমান অবস্থা এবং দেড়বছর ধরে চলমান ফিলিস্তিনে দখলদার ইস রা ইলী বাহিনীর যুদ্ধ আগ্রাসন নিয়ে কথা বলেন।
গাজ্জার নির্মমতার ছবি প্রদর্শন করলেন তুরস্কের এরদোগাঁন :
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগাঁন জাতিসংঘের অধিবেশনের উদ্বোধনের দিন ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অত্যাচারিত ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ান, মানবতার পাশে দাঁড়ান। গাজ্জার বর্বরতার ঘটনায় আপনার জনগণ ঘরে বসে কেন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে? সাহস দেখান, এখানে ব্যবস্থা নিন। গাজ্জায় যেখানে শিশুরা শিশুদের বড় করছে—সেখানে মানবিক দায়িত্ব পালন করুন। গাজ্জার নির্মমতার ছবি তুলে ধরেন। সেখানে দেখা যায়, ক্ষুধার্ত নারীরা হাতে বালতি ও হাঁড়ি নিয়ে খাবারের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, অন্তরে হাত দিয়ে বলুন, ২০২৫ সালে এই নিষ্ঠুরতার কোনও যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে? তিনি বলেন, এই লজ্জাজনক চিত্র ২৩ মাস ধরে গাজ্জায় বারবার ঘটছে। যারা নীরব থাকছে, তারা এই বর্বরতার সহযোগী।
তিনি গাজ্জা যুদ্ধকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং ক্ষুধার্ত ও অপুষ্ট এক শিশুর ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কোন মানবিক বিবেক এই দৃশ্য সহ্য করতে পারে? কে বা নীরব থাকতে পারে? যখন শিশুরা খাদ্য ও ওষুধের অভাবে মারা যাচ্ছে, তখন কি এই পৃথিবীতে শান্তি সম্ভব?
এরদোগান গাজ্জায় চলমান যুদ্ধ বন্ধে আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ভাষণে তিনি বলেন, আমরা আর এই উন্মাদনা চালিয়ে যেতে পারি না। গাজ্জায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি হতে হবে। হামলা বন্ধ করতে হবে এবং কোনো বাধা ছাড়াই মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দিতে হবে। যারা গণহত্যা করছে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৫৮ বছর পরে জাতিসংঘ অধিবেশনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট, যা বললেন আহমেদ আল শারা :
জাতিসংঘ অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন ২৪ সেপ্টেম্বর বুধবার সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা ভাষণ দেন। এর মাধ্যমে ১৯৬৭ সালেএ পরে অর্থাৎ ৫৮ বছর পর এবারই প্রথম সিরিয়ার কোনো প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান করেন ও ভাষণ দেন। ৫৮ বছর আগে সর্বশেষ ১৯৬৭ সালে সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নুরেদ্দিন আল-আতাশি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ বছরের সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতন এবং আসাদ বিরোধী সুন্নিদের বিজয়ের পরে এটা প্রথম জাতিসংঘের অধিবেশনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট এর যোগদান ছিল।
জাতিসংঘ অধিবেশনে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ তুলে আহমেদ আল-শারা দ্রুত সংঘাত বন্ধ করে দুই রাষ্ট্র বাস্তবায়নের আহ্বানও জানান। অভিযোগ করেন, সিরিয়ার পরিবর্তনশীল সময়ের সুযোগ নিয়ে ইসরাইল নতুন করে সংঘাত সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণের মধ্যদিয়ে ইতিহাস রচনা করেন আহমেদ আল শারা। তার বক্তব্যে উঠে আসে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইসরাইলের সঙ্গে বিরোধ, দেশ পুনর্গঠন পরিকল্পনা। গাজা যুদ্ধ ইস্যুতে আল-শারা অবরুদ্ধ উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সিরিয়ার সমর্থনের কথা জানিয়ে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান।সিরিয়ার সঙ্গে গাজার তুলনা করে আল-শারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা সিরীয় জনসাধারণের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে তাদের বিচার করা হবে। তার কথায়, ‘সিরিয়া যে কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গেছে, তা কেউ কখনও অনুভব না করুক এই কামনা করি। আমরা সেই অনেক দেশের মধ্যে এক, যারা যুদ্ধ ও ধ্বংসের যন্ত্রণার সঙ্গে পরিচিত। এজন্য আমরা গাজার মানুষের পাশে দাঁড়াই। অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানাই।’
আল-শারা তার সরকারের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশের শাসন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য গৃহীত প্রধান পদক্ষেপগুলোর রূপরেখা তুলে ধরেন। নতুন আইন ও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, প্রতিনিধি নির্বাচন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের প্রত্যয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে তুলে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের অনুরোধ, তারা যেন আর সিরিয়ার জনগণকে শৃঙ্খলে আটকে না রাখে।’
যা বললেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আলিমী :
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রাশাদ মোহাম্মদ আল-আলিমী জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫) তার ভাষণে ইয়েমেনের যুদ্ধ সংকট বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় কর্মপ্রয়োগের আহ্বান জানান, তিনি ইয়েমেনের দশকেরও বেশি সময়ের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশাল মানবিক সংকট এবং সীমান্ত্রাঞ্চলীয় নিরাপত্তা হুমকির কথা তুলে ধরেন, যা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে গাজাকে “রক্তাক্ত ক্ষত” বলে বর্ণনা করেন এবং যারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি তারা তা করার আহ্বান জানান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের নৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করেন। সৌদি আরব এর ইয়েমেনের প্রতি স্থায়ী সমর্থনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ভাষণ – ইরান আর পারমাণবিক বোমা বানাবে না :
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, তেহরান কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না। বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানায় কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।ভাষণে পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক হামলার তীব্র নিন্দা করেন, যা সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করেছিল। ওই হামলায় বহু ইরানি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন এবং দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, ইসরাইলের বিমান হামলায় এক হাজারের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন এবং তেহরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে। তার ভাষায়, “দেশপ্রেমিক ও সাহসী ইরানি জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে, আগ্রাসনের সামনে কখনোই মাথা নত করবে না।”পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, ইসরাইল প্রকাশ্যে ‘গ্রেটার ইসরাইল’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ‘বাফার জোন’ তৈরির কৌশল নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রায় দুই বছরের গণহত্যা, গণ-অনাহার, দখলকৃত ভূখণ্ডে বর্ণবৈষম্য এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসনের পরও ইসরাইল এই অবাস্তব ও দুঃসাহসী পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।”


