জুলাই সনদের গণভোট ইস্যু সহ ৫ দফা দাবিতে আন্দোলনরত জামাতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আইএবি,খেলাফত মজলিস ও জাগপা সহ ৮ টি দলের উদ্যোগে গত কয়েকদিন রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহে বিশাল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৩০ নভেম্বর রাজশাহীতে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে ৮ দলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছেন, আগামীর সংসদ হবে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত সংসদ। চাঁদাবাজদের প্রতিহত করব ইনশাআল্লাহ। অতীতে যারা চাঁদাবাজি করেছে, তাদের আর খাওয়া নাই। আগামীর সংসদ হবে কোরানের সংসদ। আগামীতে সচিবালয় চলবে সংসদ চলবে বিচারালয় চলবে কোরান দিয়ে। সবকিছু চলবে কোরান দিয়ে।
রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি শেখ মো. নুরুন্নবী, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুফতি সুলতান মহিউদ্দিন, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি শেখ মো. সালাউদ্দিন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যক্ষ রোকনুজ্জামান রোকন, জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর আমির ড. মাওলানা কেরামত আলী, নায়েবে আমির ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, রাকসুর ভিপি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদসহ স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
পরদিন ১ ডিসেম্বর সোমবার খুলনা জেলার নগরীর শিববাড়ী মোড়ে (বাবরী চত্বর) ৮ দলের খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা সরওয়ার কামাল আজিজী, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদেক হক্কানি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টি বিডিপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘কোনো দেশপ্রেমিক দল চাঁদাবাজ হয়ে ৫ তারিখের পর আবির্ভূত হয়নি। যারা আবির্ভূত হয়েছিলেন, দায় ও দরদ নিয়ে তাদের সঙ্গে বসেছিলাম। এটি শহীদদের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, এটা বন্ধ করতে হবে। যদি বন্ধ করা না হয়, বিপ্লবী জনগণ, তরুণ জনতা, কোলে বাচ্চা নিয়ে রাস্তায় নেমে আসা ওই মায়েরা আমাদেরকে ক্ষমা করবেন না। বন্ধ করা হয়নি, চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। ক্ষমতায় না গিয়েও অনেকে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন। প্রশাসনিক ক্যু করার চেষ্টা করছেন।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত—এক ভাগ ’৭২ সালের বাকশালপন্থী, আর এক ভাগ ২০২৪ সালের বিপ্লবপন্থী শক্তি। রক্তের সাগর পেরিয়ে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর যেই ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত করা হয়েছে, সেই ফ্যাসিবাদ বাংলার মাটিতে আসবে না। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি কার্যকরে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। জুলাই সনদকে চূড়ান্ত আইনি ভিত্তি দিতে গণভোটের আয়োজন করতে হবে। একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে এই মাহাত্ম্যকে নষ্ট করবেন না। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করা হোক।’ তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
মঙ্গলবার ২ ডিসেম্বর ৮ দলের বরিশালে ঐতিহাসিক বেলস্ পার্ক মাঠে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে কয়েক হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখা, ঘড়িসহ আট দলের প্রতীক সংবলিত প্লেকার্ড ও পতাকা নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চরমোনাই পীর বলেন, ক্ষমতা লোভী দলকে বলতে চাই, ইতিহাস যদি না বোঝেন, জনতার কথা যদি না বোঝেন, তাহলে আপনাদেরও মানুষ বাংলার জমিন থেকে উৎখাত করে ছাড়বে এটাও বুঝবেন। যারা ক্ষমতা প্রেমিক রয়েছেন, তাদের বলতে চাই, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। চাঁদাবাজ, খুনি-দেশে অশান্তি করবে, তাদের জন্য রাস্তায় নামিনি।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, মানুষ খুন এসব দেখার জন্য রাস্তার নামিনি। ৫৩ বছরে এ-দল ও-দল সকল দল দেখেছি, কিন্তু কেউ ইসলামী আইন বাস্তবায়নের কথা বলেনি। সংসদে আমরা যেতে পারলে কোনো মায়ের কোল খালি হবে না, চাঁদাবাজ গুন্ডা থাকবেন। অবিচার থাকবে না, দেশের উন্নতি লাভ করবে। খুনি, চাঁদাবাজ, টাকা পাচারকারী, যারা বিদেশের তাঁবেদারি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের জায়গা এ দেশে হবে না। সে সমাবেশে জামাতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা সরওয়ার কামাল আজিজী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
বুধবার ৩ ডিসেম্বর রংপুরে কালেক্টরেট মাঠে ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশ হয়। সেখানে সকাল থেকেই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে কয়েক লাখ নেতাকর্মী দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখাসহ আট দলের প্রতীক সংবলিত প্লেকার্ড ও পতাকা নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন। বক্তব্যের মাঝে মধ্যে পরিবেশন হয় ইসলামী সঙ্গীত। সমাবেশে ৮ দলের নেতৃবৃন্দগন বক্তব্যে বলেন বিচার ও সংস্কার দৃশ্যমান না করেই বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য শুধু পাগল নয়, ডাবল পাগল হয়ে গেছে, আমাদের যে মৌলিক দাবিগুলো ছিল মৌলিক সংস্কার হবে। খুনি, গুমকারী এবং টাকা পাচারকারীদের দৃশ্যমান শাস্তি হবে। এরপরে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। পাশাপাশি বক্তব্যে নেতৃবৃন্দগণ জাতীয় পার্টি জাপার বিরুদ্ধেও বক্তব্য দেন।
বৃহস্পতিবার ৪ ডিসেম্বর দুপুরে ময়মনসিংহ জেলার নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে জামাতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাজহারুল ইসলাম আকন্দ, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা মহিউদ্দিন রব্বানী, খেলাফতে মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ ডেভলাপম্যান্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির মুখপাত্র রাশেদ খান উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান বলেছেন, আমরা আজকে ঘোষণা করছি, আমরা ৮ দলীয় ইসলামপন্থি এবং যারা দেশের কল্যাণ চায় দেশপ্রেমিক জনশক্তি, দেশপ্রেমিক দল যারা আছেন যারা ইসলামকে পছন্দ করেন আমরা ৮ দল তৈরি করেছি। এই ৮ দল ইসলামী আইনের পক্ষে। বাইরে যারা আছে ওরা তো মুসলমান। বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের শতকরা ৯০ জন মুসলমান। তিনি আরো বলেন ১৯৭১ সালে অত্যন্ত ভালো ও সুন্দর লক্ষ্য ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে লক্ষ্য নিয়ে ৭১ সালে সংগ্রাম করা হয়েছিল যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা কী উদ্দেশ্য সফল করে নাই। প্রথম স্বাধীনতা ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় স্বাধীনতা আবু সাঈদ আর মুগ্ধ তারা জীবন দিয়ে শুরু করে প্রমাণ করেছে প্রথম স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, দ্বিতীয় স্বাধীনতা তারা ঘোষণা করে গেছে। আরও একটা স্লোগান চালু হয়েছে, আবু সাঈদ-মুগ্ধ শেষ হয়নি যুদ্ধ। এই যুদ্ধে শরীক হতে হবে আপনাকে-আমাকে। সামনে লড়াই হবে আদর্শিক লড়াই। এ দেশের মানুষের তৈরি মতবাদ বা জাতীয়তাবাদ চালু হবে না কোরআন সুন্নাহর আইন চালু হবে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে তার পরীক্ষা হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
৫ জেলায় এ সমাবেশগুলোতে ৮ দলের সমর্থক লাখো মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে চট্টগ্রামে আজ ৫ ডিসেম্বর ৮ দলের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামীকাল ৬ ডিসেম্বর সিলেটে ৮ দলের বিভাগীয় সমাবেশ এর মাধ্যমে বিভাগীয় কর্মসূচি সমাপ্ত হবে।


