খুলনা ও দিনাজপুর জেলায় পৃথক পৃথক দিনে যথাযোগ্য মর্যাদায় সেখানকার ইমামীয় শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন আশুরার ৪০ দিন স্মরণে আরবাঈন বা চেহলুম পালন করেছে যেখানে ইমামবাড়ায় শোক মজলিস ও বড় আকারে র্যালী মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিবছরের মতোই এবারও ২১ সফরে খুলনার মারকাজ দেরাসাত আঞ্জুমানে পাঞ্জাতনী শিয়া মসজিদ ইমামবাড়ায় খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ের বাৎসরিক চেহলুম বা আরবাঈন পালিত হয়েছিল।
গত ০৫ আগস্ট বুধবার (২১ সফর) খুলনা শহরে এক শোক মজলিস আয়োজিত হয়; যেখানে আহলুল বাইত এর হাজার হাজার অনুসারী শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন ও ভক্ত সমবেত হন এবং শোকমিছিল ও মাতমের মধ্য দিয়ে আহলেবাইতকে স্মরণ করেন।এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ‘কাউন্সিল অফ ইমামি স্কলারস’-এর প্রধান শিয়া আলেম সাইয়্যেদ ইব্রাহিম খলিল রাজাভি আশুরা আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন যে, কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা: ও আ.) ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গীদের সেই জাগরণ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, বরং তা দিকনির্দেশনার আলোকবর্তিকা এবং স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার এক চিরন্তন প্রতীক।তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো দমনমূলক সরকার বা স্বৈরাচারী শক্তিই আশুরার সত্য-সন্ধানী ও মানব-রূপান্তরকারী বার্তাকে স্তব্ধ করতে পারেনি—এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।
পরবর্তীতে, বাংলাদেশে আল-মুস্তফা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ শাহাবুদ্দিন মাশায়েখি মন্তব্য করেন যে, এই সমাবেশের অংশগ্রহণকারীরা কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য নিয়ে একত্রিত হননি; বরং ইমাম আবা আবদিল্লাহ আল-হুসাইন (রাঃ ও আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তিই তাঁদের এই মহিমান্বিত আয়োজনে একত্রিত করেছে। তিনি উল্লেখ করেন: আমাদের সকলেরই উচিত ইমাম হোসাইন (রাঃ ও আ.)-এর শিক্ষা ও জীবনধারাকে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করা এবং কখনোই নিপীড়ন, দুর্নীতি বা মিথ্যার কাছে মাথা নত না করা। বিশিষ্ট সুন্নি সুফি আলেম মাওলানা মনজুরুল ইসলাম কাদেরী বলেন: আল্লাহ মানুষকে দুটি শিবিরে বিভক্ত করেছেন—একটি ঐশ্বরিক শিবির এবং অন্যটি শয়তানের শিবির।যারা মহানবী (সা.) ও আহলে বাইত (আ.)-কে ভালোবাসেন এবং তাঁদের আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তাঁরা ঐশ্বরিক শিবিরের অন্তর্ভুক্ত; পক্ষান্তরে যারা ঐশ্বরিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে অত্যাচারী ও ধর্মের শত্রুদের অনুসরণ করেন, তাঁরা শয়তানের শিবিরে অবস্থান করেন।
মজলিস মাহফিল শেষে খুলনার রাজপথে এক বিশাল শোক র্যালী মিছিল বের করা হয়। যেখানে “আল্লাহু আকবার”, “ইয়া রাসূল-আল্লাহ” ও “ইয়া হুসাইন”-এর মতো স্লোগান মুখরিত করে শিয়া সম্প্রদায় আহলে বাইত -এর প্রতি তাদের ভক্তি ও ভালোবাসা নিবেদন করেন ।
এর পাশাপাশি গত ০৮ আগস্টে (২৪ সফর) শনিবার দিনাজপুর জেলা শহরের মিশন রোডস্থ ঐতিহাসিক মাসজিদ ও হুসাইনী ইমামবাড়া ইরানীয়ান এ শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা আরবাঈন বা আশুরার চল্লিশা উপলক্ষে শোক মজলিস ও মিছিলের আয়োজন করেন। আগের দিন গত শুক্রবার বেরলভী সুন্নি ঘরানার এক আলেম ডঃ সৈয়দ এরশাদ বুখারীর অনুসারীরা দিনাজপুর জেলায় শিয়া বিরোধী উস্কানিমূলক মিছিল মিটিং করায় একধরনের অস্থিরতা ও হুমকি বিরাজ করেছিল। উস্কানি ও হুমকি সত্বেও কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে শিয়া সম্প্রদায়ের এই শোক মজলিস ও শোক তাজিয়া মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শোক মিছিলের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রদল নেতা মির্জা আসলাম আলী।
আরবাঈনের শোক মিছিলে অংশগ্রহণ করেন ঢাকা থেকে আগত মাওলানা আফতাব হোসেন নাকভী, শরীয়তপুরের মাওলানা পিয়াল হাসান, বগুড়ার মাওলানা মোজাফফর হোসেন, ঘোড়াঘাটের মাওলানা মাজেদুল ইসলাম, সৈয়দপুরের মেহেদী হাসান,খুলনার মাওলানা মজিবুর রহমান, চট্রগ্রামের মাওলানা মহসিন আলীসহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত শিয়া সম্প্রদায়ের অসংখ্য নারী-পুরুষ আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা।দিনাজপুরে এ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজনে শিয়া মুসলিমদের মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা ও ঐক্য সঞ্চারিত হয়। কালো পোশাক পরিহিত শিয়া সম্প্রদায়ে অসংখ্য মানুষ দু’হাতে বুক চাপড়িয়ে নির্দিষ্ট ছন্দ উচ্চারণের মাধ্যমে আরবাঈনের মিছিলে অংশ নেয়।
মিছিলে কালো পোশাক পরিহিত শিয়া সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষ হাতে বাঁশ, ব্যানার ও তাজিয়া নিয়ে মাইকে বয়ানে তাল মিলিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। শিয়া সম্প্রদায়ের এই শোক মজলিস ও মিছিলের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে গত দু’দিন আগে থেকে দিনাজপুর শহরে উত্তেজনা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিয়া সম্প্রদায়কে হত্যার হুমকিও দেয় একটি গোষ্ঠী। ফলে অসংখ্য পুলিশ,গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলার বাহিনী কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে শিয়া সম্প্রদায়ের এই শোক অনুষ্ঠান ও শোক মিছিল শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।


