এবার আদিবাসী শব্দের নতুন ব্যাখ্যা দিলেন আনু মুহাম্মদ : বললেন আদিবাসী মানেই বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়

আহসান শেখ : সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসী শব্দ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা বিতর্ক চলছে৷ জাতীয় শিক্ষাক্রমের নবম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ের প্রচ্ছদে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে দেয়ালে গ্রাফিতির ছবি যেখানে কয়েকটি পাতায় হিন্দু ও মুসলিম এর সাথে আদিবাসী শব্দটা যুক্ত ছিল সেই ছবি সরিয়ে ফেলার জন্য সরকারকে চাপ দিয়েছিল স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টি নামে রাজারবাগীর অনুসারীদের এক সংগঠন পরে সেই ছবি সরিয়ে ফেলার পরে ব্যাপক উত্তেজনা আরম্ভ হয়৷

বিজ্ঞাপন
Advertisement

পাঠ্যবইয়ে হিন্দু মুসলিম ও আদিবাসী শব্দযুক্ত আগের ছবি সরিয়ে জাতীয় কবি নজরুলের কবিতাযুক্ত নতুন ছবি যুক্ত করার পর প্রচন্ড রাগ ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রগতিশীল মহলের লোকজন ও সারাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের লোকজন । যার ফলে গত ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে এনসিটিবি অফিসের সামনে রাজারবাগী সমর্থিত স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টি পাঠ্যপুস্তকে ‘আদিবাসী’ শব্দ যুক্ত করার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তিসহ পাঁচ দফা দাবিতে এবং সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একদল শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ে আদিবাসী শব্দযুক্ত গ্রাফিতিটি পুনর্বহালের দাবিতে পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশ করে ৷ সেসময় পাল্টাপাল্টি হামলা আক্রমণ মারধরের ঘটনা ঘটেছিল । এতে সাংবাদিক, নারীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছিল৷

সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের সমাবেশে রূপাইয়া তঞ্চঙ্গাসহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক সদস্যরাও ছিলেন ৷ স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টি দাবি করেছে, তাদের ওপর হামলা হয়েছে। অন্যদিকে সংক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র-জনতা দাবি করেছে, তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে । এ ঘটনার পরেই বিভিন্ন পক্ষ থেক্ব নিন্দা ক্ষোভ ও প্রতিবাদ এসেছিল৷ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ৷ পরে হামলায় জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়৷

১৫ জানুয়ারীর ঘটনার প্রতিবাদে সারা দেশে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী র লোকজন ও তাদের সংগঠনসমূহ এবং কয়েকটি বামপন্থী দলগুলো বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করে। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করে বলেন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হাঁটছে না৷

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, আদিবাসী শব্দ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কারও আপত্তি থাকলে আলোচনা করা যেতে পারে। আদিবাসী শব্দ থাকায় পাঠ্যবই থেকে গ্রাফিতি হঠাৎ বাদ দেওয়া এবং এর প্রতিবাদ করতে গেলে একটা গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী আক্রমণ। সরকারকে তাদের বিষয়ে খুবই নমনীয় দেখা যাচ্ছে। সেই হামলার প্রতিবাদ করতে গেলে পুলিশ আবার আগের মতো করে আক্রমণ করল। এর পুরো দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপর পড়ে। এর জন্য সরকারকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। সরকার এ আক্রমণ করেছে। পুলিশি আক্রমণ, সন্ত্রাসী আক্রমণ ও ভ্যাটের আক্রমণ—এই তিন ধরনের আক্রমণ থেকে সরকারকে অবশ্যই সরে আসতে হবে ।

আদিবাসী মানে আদি বাসিন্দা নয়—জানিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আদিবাসী যেখানেই থাকুক, তিনি আদিবাসী। তাঁর নিজস্ব একটা সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আইনি কাঠামো আছে। আলাদা একটা জাতিগত বৈশিষ্ট্য আছে। সেটা বাংলাদেশের মানুষ স্বীকার করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সমস্যা হয়েছে শেখ মুজিব থেকে। যাঁরা বলছেন, শেখ মুজিব ফ্যাসিবাদী শাসনের সূচনা করেছেন, সেই ফ্যাসিবাদের অন্যতম উপাদান হলো অন্যান্য জাতিকে অস্বীকার করা। এটা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন আদিবাসী বলত। কিন্তু ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় এল, তখন হঠাৎ করেই বলল, আদিবাসী ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে আদিবাসী এ ধারণাকে অস্বীকার করার একটা রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে। ফলে যাঁরা ক্ষমতায় যান, তাঁরা অস্বীকার করতে চান। তাঁদের একটা যুক্তি, আদিবাসী বলে স্বীকার করলে বাংলাদেশ থেকে আলাদা হয়ে যাবে। অথচ যাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, তারা বারবার বলছে, আমরা বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, বাংলাদেশে থাকতে চাই।’

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img