আহসান শেখ : ছয় সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরির প্রয়াস শুরু করল অন্তর্বর্তী সরকার। এ উদ্যোগকে সরকারের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যদিকে সরকারের এই প্রয়াসকে একটি সূচনা পর্ব হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের আশা, খুব দ্রুতই সংস্কারের ব্যাপারে ন্যূনতম ঐকমত্যের ভিত্তিতে অতি দ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গত ১৫ ফেব্রুয়ারী শনিবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে প্রথম বৈঠক করে। এতে ছয় সংস্কার কমিশনের প্রধানেরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি, ইসলামী আন্দোলন, এলডিপি, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাম গণতান্ত্রিক জোট,জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণফোরাম, খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদসহ ২৭টি দল ও জোটের প্রায় ১০০ রাজনীতিক এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয় মাসে প্রথম ইনিংস বা প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। প্রথম পর্ব ছিল প্রস্তুতি পর্ব। আজ রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো।
রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বেলা তিনটার পর থেকে প্রায় চার ঘণ্টা এই বৈঠক চলে। বৈঠকের পর তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁদের মনে হয়েছে, সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে সরকার কিছুদিন নানাভাবে চর্চা করবে। শেষ পর্যন্ত সব বিষয়ে হয়তো ঐকমত্য হবে না। তখন সরকার তার মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।
বৈঠক শেষে বিভিন্ন দলের নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের প্রথম সভায় প্রধান উপদেষ্টা সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদনগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার কথা বলেছেন। এরপর একটা ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। সেটাই আজকের বৈঠকের মূল কথা।
ফখরুল বলেন, ‘আমরা আশা করি, খুব দ্রুত এই সংস্কারের যে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হবে এবং সেটার ওপর ভিত্তি করে অতি দ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একেবারে পজিটিভ কনস্ট্রাকটিভ কোনো আলোচনা আজকে হয়নি, সুযোগও ছিল না।’
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহ উদ্দিন আহমেদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
বৈঠকে মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী, অলি আহমেদের নেতৃত্বে এলডিপি, সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহর নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন, মোস্তফা জামাল হায়দারের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে নাগরিক ঐক্য, এসএম আলতাফ হোসেন ও সুব্রত চৌধুরীর নেতৃত্বে গণফোরাম, জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বে গণসংহতি আন্দোলন, সাইফুল হকের নেতৃত্বে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আবদুল বাছিদ আজাদ ও আহমেদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে খেলাফতে মজলিস, আন্দালিব রহমান পার্থের নেতৃত্বে বিজেপি, নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাসদ, মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে এবি পার্টি, নুরুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ, মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, খন্দকার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে জাগপা, ফরিদুজ্জামান ফরহাদের নেতৃত্বে এনপিপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন।
এ ছাড়া নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক কমিটির চার সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেন। অন্যরা হলেন আখতার হোসেন, সারজিস আলম ও সামান্তা শারমিন।
আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, সংবিধান ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশনগুলো ইতিমধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পুরো সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে সাত সদস্যের ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করে সরকার। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজকে এই কমিশনের সহসভাপতি করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছয় কমিশনের প্রতিবেদনগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সঙ্গেও কথা বলবে ঐকমত্য কমিশন।


