একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত : শহীদ মিনারে প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা, হাজারো মানুষের ঢল

আহসান শেখ : যথাযোগ্য মর্যাদায় গেল ২১শে ফেব্রুয়ারী (শুক্রবার) শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে । ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) য় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয় যেখানে ঢাকায় সালাম বরকত সহ ৫ জন শহীদ হয়৷ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে ১৯৫৩ সাল থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারী শহিদ দিবস বা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় দিবস।২০০০ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে একে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। স্বৈরাচারী হাসিনার সরকারের পতনের পরে এটা ছিল প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারী।

বিজ্ঞাপন
Advertisement

 

এবারও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সহ সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও বিভিন্ন দল সংগঠন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আলোচনা সভা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে ।

 

একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে  অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পৃথক বানী দিয়েছেন । তবে এবার হঠাৎ রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে কোনো বানী দেন নাই। প্রধান উপদেষ্টা তার বাণীতে বলেছেন, ‘শত বছরের শোষণে ও শাসনে জর্জরিত বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের প্রথম জয়যাত্রা ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিতে। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের ভিত রচিত হয়েছিল। এ দিনে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা করতে প্রাণোৎসর্গ করেছিলেন আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমানসহ আরও অনেকে।’১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ ও দেশের ভাষাগুলোর মর্যাদা রক্ষায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে, যা দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতেও সরকার কাজ করছে। এছাড়াও, ব্রেইল বইসহ বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সবাইকে মহান শহিদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৫ এর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। এ উপলক্ষে নেওয়া সব কর্মসূচির সাফল্য কামনা করছি।”

২১ ফেব্রুয়ারী প্রথম প্রহরে রাত ১২:০১ মিনিটে রাজধানীর ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি শহীদ মিনার থেকে বের হওয়ার দশমিনিট পরে রাত ১২:১০ এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড: মুহাম্মদ ইউনুস শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

পরে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ,অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টাগণ, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান,সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন,বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলমসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানগণ,প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সহ নির্বাচন কমিশন, ঢাকায় দায়িত্বরত বিদেশি রাষ্ট্রদূত,কূটনীতিক, হাই-কমিশনারগণ ও জুলাই আগস্ট অভ্যুত্থানে আহতদের পরিবার ও তাদের প্রতিনিধি দল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন৷ ২১ ফেব্রুয়ারীর প্রথম প্রহরে রাত ১২:৪০ এর পর থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ অন্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসেন।

জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজনে রয়েছে সেই অভ্যুত্থানের ছাপ। এবারও প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুপস্থিত ছিল বিএনপি।অন্য রাজনৈতিক,অরাজনৈতিক ও পেশাজীবি বিভিন্ন দল সংগঠনের মধ্যে প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে এসেছিল বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ, জেএসডি,নাগরিক ঐক্য,বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ কংগ্রেস, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, এবি পার্টি, সাম্যবাদী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি (জাপা),জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপা,সিপিবি,বাসদ,জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর),গণ ফোরাম, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, জাতীয় নাগরিক কমিটি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। জাতীয় নাগরিক কমিটির আখতার হোসেন ও সারজিস আলম সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উমামা ফাতেমা সহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সমন্বয়কগণ শহীদ মিনারে উপস্থিত ছিলেন।

 

শুক্রবার ২১শে ফেব্রুয়ারী ভোর ০৬ টার পরে প্রভাতফেরী শুরু হয় । প্রভাতফেরীতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষজন,বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং সামাজিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক পেশাজীবি সংগঠনসমূহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ১৯৫২ এর ভাষা শহীদ ও ২০২৪ এর জুলাই আগস্ট অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। অনেকেই “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী” সহ ভাষার গান দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন । এদিন সারা দেশে নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে উড়ানো হয়।

একুশে ফেব্রুয়ারী সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিএনপির বিভিন্ন থানা ওয়ার্ডের নেতাকর্মীগন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ৷ প্রভাতফেরীতে বিএনপির পাশাপাশি জাকের পার্টি,এনডিএম,উদীচি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শহিদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বাংলাদেশে অবস্থানরত অনেক বিদেশী নাগরিক পর্যটকগণ শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শুক্রবার দুপুর একটায় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন সমাপ্তি হয়।

 

এর পাশাপাশি ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, কবর জিয়ারত ও দোয়া মোনাজাত করেন অনেকে লোকজন ৷ জামাতে ইসলামী,ইসলামী ছাত্রশিবির,ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ,বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা,ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশসহ অনেক দল সংগঠন আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত করে সেখানে দোয়া মোনাজাত করেন। ২১শে ফেব্রুয়ারীর দিন সকালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে কুরআন তিলাওয়াত, আলোচনা ও দোয়া মাহফিল হয়৷ এবার একুশে ফেব্রুয়ারীর দিন শুক্রবার হওয়াতে সারা দেশের অধিকাংশ মসজিদগুলোতে জুমার নামাজের পরে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন ও ২০২৪ এর জুলাই–আগস্টে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের জন্য দোয়া করা হয়। রেডিও ও টিভিতে একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারিত হয়।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img