মাহে রমজান : কতিপয় বিধান এবং দোয়াসমূ
চলছে পবিত্র মাহে রমজান মাস । এ মাসেই মুসলিমগণ একমাস সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত রোজা রাখেন। ইসলামের বিধান অনুযায়ী রমজান মাসের রোজা ফরজ৷ হিজরী বছরের নবম মাস এই রমজান মাস৷ রমজান মাসেই পবিত্র কুরআন মাজীদ অবতীর্ণ বা নাজিল হয়৷ রমজানের প্রথম দশককে রহমত, দ্বিতীয় দশককে মাগফিরাত ও তৃতীয় বা শেষ দশককে নাজাতের দশক হিসেবে মনে করা করে থাকেন অনেক মুসলিমরা ৷ সাহরীর মাধ্যমে রোজা শুরু হয় ও ইফতারের মাধ্যমে শেষ হয়। রমজান মাসের রাতগুলোতে তারাবীহর নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে ও রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর হয়ে থাকে । আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে রমজানের এই সকল বিষয়ে বিধি বিধান মাসায়েল ও কতিপয় দোয়া তাসবীহ উল্লেখ করা হলো৷
রমজানের রোজা বিষয়ে কুরআন যা বলে : আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য অন্যতম বিশেষ নেয়ামত হলো রমজান মাস। এ মাসে মহাগ্রন্থ আল কুরআন হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।আর এ মাসে সিয়াম সাধন করা প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির উপর ফরজ । তবে মুসাফির এবং অসুস্থ (এমন অসুস্থতা যা রোগ-কে আরো তীব্র করে কিংবা জীবন নাসের আশঙ্কা হয়) ব্যক্তির জন্য পরবর্তী কাজা আদায় করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।নির্দিষ্ট কয়েক দিন। তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ হবে, কিংবা সফরে থাকবে, তাহলে অন্যান্য দিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর যাদের জন্য তা কষ্টকর হবে, তাদের কর্তব্য ফিদয়া- একজন দরিদ্রকে খাবার প্রদান করা। অতএব যে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত সৎকাজ করবে, তা তার জন্য কল্যাণকর হবে। আর সিয়াম পালন তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জান।
রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।
সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর। (সুরা বাকারা ১৮৩-১৮৫)
রমজান মাসের রোজা রাখার জন্য অন্যতম শর্ত হলো মাস উপস্থিত হওয়া। আর রমজান মাসের সূচনার অন্যতম উপায় হলো চাঁদ উদিত হওয়া। রোজা রাখা এবং ঈদ পালন চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এমনটাই নির্দেশ করেছে।
ইবনু আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা রমজানের পূর্বে রোযা রেখ না। তোমরা রমজানের চাঁদ দেখার পর রোজা রাখা আরম্ভ কর এবং চাঁদ দেখার পর তা ভাঙ্গ। মেঘের কারণে চাঁদ দেখা না গেলে তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। (জামে-তিরমিজি)
রমজান মাস বিষয়ে কিছু হাদিস : পবিত্র এ মাসে বান্দা যেন এখলাসের সাথে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারেন, এজন্য পাপিষ্ঠ শয়তানকে এ মাসে বন্ধী রাখা হয় এবং বান্দাকে নেক-আমলের প্রতি উৎসাহিত করা হয় আর অপরাধীদেরকে অপরাধ থেকে বারণ করা হয়। এমনকি এ রমজানের উসিলায় এ মাসে অসংখ্য বান্দাকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করেন। এজন্য বান্দার উচিত বেশি বেশি নেক-আমল ও এস্তেগফার করা। যেমনিভাবে হাদিস শরিফে এসেছে,হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যখন রমজান মাসের প্রথম রাত আসে, তখন শয়তান ও অভিশপ্ত জিনদের শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, তার একটি দরজাও খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এর একটি দরজাও বন্ধ হয় না এবং একজন ঘোষক ডেকে বলেন, হে সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, অগ্রসর হও। হে অসৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি, থেমে যাও। আল্লাহ তায়ালা (রমজানের) প্রতিটি রাতে অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি)।
আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় রমজান মাসের সিয়াম রাখলো, তার পূর্বের গুনাহ সমূহ মাফ করা হলো। (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
সাহরি ও ইফতার : সাহরি ও ইফতার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সাহরির মাধ্যমে রোজার প্রস্তুতি এবং ইফতারের মাধ্যমে সমাপ্তি। শুরু এবং শেষের এ দুটি পর্যায়ের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত। আরবি ‘সাহরি’ শব্দের অর্থ ‘ভোর রাতের খাবার’। রোজা রাখার উদ্দেশে রাতের শেষাংশে আহার করার নামই সাহরি। নবীজি সা: এর উপর পবিত্র কুরআনের আয়াত নাজিল হয়
“তোমরা খাও এবং পান করো, যতক্ষণ না কালো রেখা(রাতের অন্ধকার) থেকে সকালের সাদা রেখা(সুবহে সাদিক) প্রকাশ পায়। আর রোজা পূর্ণ করো রাত না-আসা পর্যন্ত।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। জায়েদ বিন সাবিত রা. হতে বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহরি খেয়েছি। অতঃপর নামাজে দাঁড়িয়েছি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘দুয়ের (নামাজ ও সাহরি) মাঝে ব্যবধান কতক্ষণ ছিল?’ তিনি বললেন, ‘প্রায় পঞ্চাশ আয়াত পড়ার মত সময় পরিমাণ।’ (সহিহ বুখারি)আনাস বিন মালিক রা. হতে বর্ণনা। নবিজি ইরশাদ করেছেন, “তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত আছে।” সহিহ বুখারি, হাদিস:১৯২৩। অপর হাদিসের ভাষ্য এমন: আল্লাহ তাঁদের প্রতি করুণা বর্ষণ করেন, যাঁরা সাহরি খায়। আর ফেরেশতারাও তাদের জন্য দোয়া করে থাকেন। হাদিসটি ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩৬৬৭।
আরবি ‘ইফতার’ শব্দের অর্থ ‘ভঙ্গ করা, নিষ্কৃতি লাভ করা’। সূর্যাস্তের পরপর কোনোকিছু খেয়ে রোজা ভঙ্গ করাকে বলা হয় ইফতার। সুতরাং কেউ যদি সূর্যাস্তের পূর্বে খেয়ে ফেলে, তবে তার রোজা সম্পূর্ণ হবে না।হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে আছে যে, রোজা পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দময় মূহুর্ত আছে। এক: ইফতারের সময়, দুই: আল্লাহ তায়ালার সাথে সাক্ষাতের সময়(কিয়ামতের দিন)। আর রোজা পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার নিকট কস্তুরির সুগন্ধ অপেক্ষা অধিক পছন্দনীয়। সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস: ২২১৪।
ইফতারের সময় কখন? এ ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে,অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত’ (সুরা বাকারা)। সুতরাং রাতের আগমন তথা সূর্যাস্তের মাধ্যমে রোজা পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে এক হাদিসে রাসূল সা. বলেন,ইবনে আবু আওফা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক সফরে আমি নবী (ﷺ) এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত রোযা পালন করেন। এরপর এক ব্যক্তিকে বললেনঃ সওয়ারী হতে নেমে ছাতু গুলিয়ে আন। লোকটি বলল, আপনি যদি (পূর্ণ সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত) অপেক্ষা করতেন। তিনি রাসূল (ﷺ) পুনরায় বললেনঃ নেমে আমার জন্য ছাতু গুলিয়ে আন। (তারপর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ) যখন তুমি এদিক (পূর্বদিক) হতে রাত্রির আগমন দেখতে পাবে তখন রোযাদার ইফতার করবে। [সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ১৮৩৪]
সাহল ইবনে সা’দ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ লোকেরা যতদিন যাবৎ ওয়াক্ত হওয়ামাত্র ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ১৮৩৩)
তারাবীহর নামাজ : পবিত্র রমজান মাসে এশার নামাজের পর বিতিরের আগে যে সুন্নত নামাজ পড়া হয়, তা-ই তারাবির নামাজ। তারাবির নামাজ পবিত্র রমজানের অন্যতম প্রতীক। শুধু রমজানেই এই নামাজ পড়া হয়। তারাবি (আরবি উচ্চারণে তারাবীহ) শব্দের অর্থ বিশ্রাম করা। সলফে সালেহিন (সাহাবি, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়িগণের প্রজন্ম) যখন এই নামাজ আদায় করতেন, প্রতি চার রাকাত অন্তর বিরতি নিতেন। বিরতি নিয়ে এই নামাজ পড়া হয় বিধায় একে তারাবি বলা হয়।
প্রিয়নবী মুহাম্মদ (স.) তারাবি নামাজ পড়েছেন এবং অন্যদের পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন। তারাবির নামাজ ফরজ বা ওয়াজিব নয়। বরং সুন্নত। ফরজ হয়ে যাওয়ার আশংকায় নবীজি দুই বা তিন দিন জামাতে তারাবি পড়ানোর পর চতুর্থ দিন আর পড়াননি। (দ্র: সহিহ বুখারি: ৯২৪; সহিহ মুসলিম: ৭৬১) নবীজির ইনতেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম গুরুত্বের সঙ্গে তারাবি নামাজ আদায় করেছেন। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, মুসলিম নারী-পুরুষ সবার জন্য তারাবি নামাজ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে ইমামীয় শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমরা জামাতে তারাবীহ পড়াকে নিরুৎসাহিত করে থাকে৷ তারাবীহর নামাজে দুটো পদ্ধতি আছে একটি সুরা তারাবীহ আরেকটি খতম তারাবীহ। তারাবীহর নামাজের রাকাত নিয়ে মতবিরোধ আছে কারও মতে ৮ বা ১০ রাকাত তবে হানাফি ফিকহে তারাবীহ ২০ রাকাত কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।


