যথাযোগ্য মর্যাদায় ঈদুল ফিতর পালিত

যথাযোগ্য মর্যাদা, ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে এবং ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে মুসলিম উম্মাহর বড় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছে। ঈদের নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে মুসল্লিরা পরস্পর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। দিনটিতে বিভিন্ন হাসপাতাল, জেলখানা, শিশুসদন, ভবঘুরে কেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্রে পরিবেশন করা হয় বিশেষ খাবার। ঈদ আনন্দের দিন হলেও বিগত বছরগুলোতে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসব পালনে ছিল নানা বিধিনিষেধ তথা কড়াকড়ি। ছিল ভয়, শঙ্কা ও গ্রেফতার আতঙ্ক। বিশেষ করে আঃলীগ ও সমমনা দল ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জন্য দিনটি বয়ে আনত চাপা কষ্টের ও আতঙ্কের। কারণ উত্সবের দিনও তারা পরিবারের সঙ্গে স্বাধীনভাবে দিনটি উদ্যাপন করতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন
Advertisement

 

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দেশে এখন অবারিত স্বাধীনতা বিরাজ করছে। আর তার মধ্যেই এসেছে প্রথম ঈদ। চাঁনরাতেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-নগর, গ্রামাঞ্চলে ঈদুল ফিতরকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল, আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে মানুষ। সোমবার ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ঈদের আনুষ্ঠানিকতা। কুশল বিনিময়, কোলাকুলি, স্বজনের কবর জিয়ারত, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখা-সাক্ষাত্ করে সোমবার সময় পার করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।

সোমবার সকাল সাড়ে আটটায় রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে । যেখানে ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক ও মোকাব্বিরের দায়িত্ব পালন করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন কারি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। ঈদ জামাতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের হাজারো মানুষ নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে খুতবা পাঠ করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। এর আগে আলোচনায় দেশ ও মুসলিম জাতির কল্যাণে দোয়া করা হয়। ঈদের প্রধান জামাতের আয়োজন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ জানায়, ২৫ হাজার ৪০০ বর্গমিটার আয়তনের মূল প্যান্ডেলে একসঙ্গে ৩৫ হাজার মুসল্লি ঈদের জামাত আদায় করেছেন। ঈদের প্রধান জামাতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্য নামাজের আলাদা ব্যবস্থা ছিল।

 

জাতীয় ঈদগাহের পাশাপাশি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে যথাক্রমে সকাল ৭ টা,০৮ টা, ০৯ টা, ১০টা ও সকাল ১০:৪৫ এ পাঁচটি ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ শাহাবুদ্দিন চুপ্পু জাতীয় ঈদগাহের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনের মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সকাল ৭:৩০ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে আহলে হাদিস সালাফী মুসলিমদের উদ্যোগে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। একইসময় পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া ধূপখোলা মাঠে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়৷

রাজধানী ঢাকায় মহাখালী গাউসুল আজম মসজিদ,গুলশান আজাদ মসজিদ,শাহজাহানপুর গাউসুল আজম মসজিদ,ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদ,সাতগম্বুজ মসজিদ,মসজিদ আল মোস্তফা মাদানী এভিনিউ,সোবহানবাগ জামে মসজিদ,সায়েদাবাদ ফয়জানে মদীনা মসজিদ,পুরান ঢাকার তারা মসজিদ,চকবাজার মসজিদ,কুলুটোলা মুফতি মসজিদ,সূত্রাপুর জামে মসজিদ,নারিন্দা বিনত বিবির মসজিদ সহ ঢাকার অধিকাংশ মসজিদগুলোতে সকাল ০৭ টা থেকে পৃথক পৃথক সময়ে ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয় যেখানে মুসলিমগণ অংশগ্রহণ করেন । মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ,মিরপুরের কারবালা মারকাজী ইমামবাড়া শিয়া মসজিদ, পল্টন খোজা শিয়া মসজিদ ইমামবাড়া ও পুরান ঢাকার হোসেনী দালান ইমামবাড়ায় শিয়া সম্প্রদায়ের বিধান অনুযায়ী ঈদের নামাজ ও খুতবা অনুষ্ঠিত হয় যেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমরা অংশগ্রহণ করেন,ঈদের নামাজের আগে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমগণ দোয়া এ নুদবা নামে তাদের একটা বিশেষ দোয়া পাঠ করেন৷

ঢাকার বাইরে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ,দিনাজপুরের গোর এ শহীদ ঈদগাহ,ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাহ,চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ময়দান,সিলেটের হজরত শাহজালাল দরগা ঈদগাহ মাঠ সহ সারা দেশের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

 

ঈদের দিন রাষ্ট্রপতি সকাল ১০ টায় বঙ্গভবনে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন৷ প্রধান উপদেষ্টা ঈদের দিন বিকাল ৪টায় তার তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

 

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আয়োজনে পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় যেখানে সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জেলা প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন । ঈদ জামাত শেষে আগারগাঁওয়ে  সকাল ৯টায় ডিএনসিসির ঈদ আনন্দ মিছিল শুরু হয়। ঈদ মিছিলটি পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠ থেকে শুরু হয়ে সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। ঈদ মিছিলটি ছিল বর্ণাঢ্য। তবে এই ঈদ মিছিল নিয়ে ব্যাপক আপত্তি ও বিতর্ক দেখা যায়।

 

এছাড়া সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে মিছিল গিয়ে শেষ হওয়ার পর সেখানেই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে শিল্পীরা ঈদের গান পরিবেশন করেন। ছিল বাউলশিল্পীদের পরিবেশনা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় সাধারণ মানুষদের আপ্যায়ন করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এ সময় ঈদের সেমাই, মিষ্টি ও বাতাসা খেতে পারছেন। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটির ঈদ আনন্দ উত্সবের অন্যতম অনুষঙ্গ দুই দিনব্যাপী হয় ঈদ আনন্দমেলা। ঈদের দিন ও এর পরদিন এ মেলা হয় বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ২০০টির বেশি স্টল থাকে। দুই দিনই মেলা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে। মেলায় শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা থাকে। খেলাধুলার জন্য রাখা হয় বিভিন্ন খেলার সামগ্রী। অন্যদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img