শত বাধা বিপত্তি সংকীর্ণতা ও গুজব পেরিয়ে গত ২৬ এপ্রিল শনিবার রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ম্যাস গ্যাদারিং ফর প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ও ভারতসহ সারা বিশ্বের নিপীড়িত মুসলিমদের পক্ষে সংহতি জানাতে সমাবেশ করেছে আধিপত্যবাদবিরোধী মুসলিম ঐক্যমঞ্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি না পেয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সকাল দশটা থেকে দেড়ঘন্টা এই কর্মসূচি পালিত হয়।
ফজরের নামাজের পর থেকেই সমাবেশস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। চারদিক থেকে রাজধানীমুখী জনশ্রোত ছিল লক্ষণীয়। নারায়ে তাকবির ও নারায়ে রিসালাত এ গগণবিদারী স্লোগানে মুখরিত হয় আকাশ-বাতাস। সমাবেশের অনুমতি ছিল বহুমাত্রিক টালবাহানা। আয়োজক কমিটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জন্য আবেদন করলেও প্রশাসন এতে অপারগতা প্রকাশ করে। অতঃপর গোলাপবাগ মাঠে অনুমতি দেয়ার কথা বলা হয়। সর্বশেষ জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরেই ওই সমাবেশ আয়োজন করার অনুমতিপত্র ইস্যু করে প্রশাসন। শনিবারের এই সমাবেশের নেপথ্য কারিগর ছিলেন পীর আল্লামা ছৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী,মাওলানা এম এ মতিন, শায়খুল হাদিস প্রিন্সিপাল আল্লামা জয়নুল আবেদীন জুবাইর, স উ ম আবদুস সামাদ, আবুল ফারাহ ফরিদ উদ্দিন, পীর মাওলানা সাইফুদ্দিন হাসানী মাইজভান্ডারী, ডঃ এ কে এম মাহবুবুর রহমান ও মুফতি ওসমান গনী সালেহী।
আধিপত্যবাদ বিরোধী মুসলিম ঐক্যমঞ্চের সভাপতি ও মশুরিখোলা দরবার শরিফের পীর শাহ আহসানুজ্জামান এই সংহতি সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন। এতে বক্তব্য দেন ইসলামী বক্তা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসান আরিফ, আল্লামা সৈয়দ নাসেরুল হক চিশতি, আল্লামা কাজি মাইনুদ্দীন আশরাফি, আয়োজক কমিটির মুফতি আবুল কাশেম মোহাম্মদ ফজলুল হক, পীরে তরিকত আল্লামা হাবিব উল্লাহ বাগদাদী ও আল্লামা জসিম উদ্দিন আজহারী। আরো বক্তব্য দেন আনম মাসউদ হোসাইন আল কাদেরী, আবু জাফর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান আল আযহারী।
এ সময় তারা ফিলিস্তিনির ওপর ইসরাইলের বর্বর হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানান। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ফিলিস্তিনের মজলুম মুসলমানদের ওপর ইসরাইলের চরম বর্বরতা ও নৃশংসতা আর সহ্য করা যায় না। যতোদিন প্রাণ থাকবে, ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মুসলিমদের পক্ষে কথা বলা আমরা বন্ধ করবো না।
তারা বলেন, ইসরাইলের আধিপত্য এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও এর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। বক্তারা বলেন, ভারতের মোদি সরকারও দক্ষিণ এশিয়ায় ইসরাইলি ধাঁচের আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় মুসলিম-বিরোধী ও অসাংবিধানিক ওয়াক্ফ বিল পাস হয়েছে। এ ঘটনাকে ন্যক্কারজনক আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানান তারা। তারা বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম নাগরিক হিসেবে ভারতীয় সংখ্যালঘু মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো ঈমানি দায়িত্ব। ভবিষ্যতেও এ দায়িত্ব পালনে পিছপা হবেন না তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে পবিত্র মাজারে হামলা প্রসঙ্গে তারা বলেন, ৫ই আগস্ট থেকে দেশে অসংখ্য মাজারে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যা সুস্পষ্টভাবে জুলুম ও অমানবিক। বক্তারা সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে যদি কোনো মাজারে হামলা হয়, তাহলে সম্মিলিতভাবে তা প্রতিরোধ করা হবে। একইসঙ্গে, ভারতে মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনায় হামলার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানানো হয় এবং ঘোষণা দেয়া হয়, সেখানে হামলা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
আধিপত্যবাদবিরোধী মুসলিম ঐক্যমঞ্চের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি পেশ করা হয়। দাবিসমূহ হচ্ছেÑ জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, ইসরাইলের হামলায় ফিলিস্তিনের যত কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে সব কিছুর আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের সরাসরি হস্তক্ষেপে এরই মধ্যে যত হত্যা হয়েছে সব হত্যাকা- ও হামলার তদন্তপূর্বক বিচার নিশ্চিত করতে হবে, ভারতের লোকসভায় পাস হওয়া অসাংবিধানিক ও মুসলিমবিরোধী ওয়াকফ বিল বাতিল ঘোষণা করতে হবে, ৫ আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত মাজারে যত হামলা-অগ্নিসংযোগ হয়েছে সবগুলো ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং সব রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এই সমাবেশ থেকে মানুষদের তিনটি অঙ্গীকার করানো হয়। অঙ্গীকার তিনটি হলো ইসরাইল ও ভারতসহ সব প্রকার বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ভূমিকা জারি রাখব, আওয়ামী লীগসহ সব দেশীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখব এবং বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও গোষ্ঠীস্বার্থে যেকোনো সময় যেকোনো মূল্যে আমরা ময়দানে নামতে প্রস্তুত থাকব। পরে মিলাদ ও নারিন্দার পীর সাহেবের মোনাজাতের মাধ্যমে সমাবেশ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। দুপুর ১২ টায় সমাবেশ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রশাসনের অজুহাতের কথা বলে মঞ্চে থাকা এনসিপি নেতাদের চাপে সকাল সাড়ে এগারোটার আগেই সমাবেশ শেষ হয়ে গিয়েছিল।


