বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞানচর্চা, শিক্ষকতা ও হাদিস চর্চার জগতে মুফতি আব্দুস সালাম দা.বা. এক প্রাজ্ঞ, বিদগ্ধ , নিরব কর্মবীর। আলেম সমাজে তিনি শুধু একজন মুহাদ্দিস, বা শিক্ষক নন—তিনি ইলমের মিনারে এক উজ্জ্বল দীপ্তি। দীর্ঘদিন ধরে দীন ও ইলমের খেদমতে তাঁর অবদান দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই নিবন্ধে তুলে ধরা হলো তাঁর জীবনের শিক্ষামূলক, পেশাগত এবং সামাজিক অবদানের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র।
শৈশব ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট:
মুফতি আব্দুস সালাম ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার উত্তর আমিনবাজার ইউনিয়নের উত্তর কাউন্দিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা আবু তাহের এবং দাদা ছিলেন আব্দুর রহমান। পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশেই তাঁর শৈশব কাটে। তাঁর বাল্যশিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর বিদুষী মায়ের কাছেই, যিনি নিজেও ছিলেন একজন শিক্ষিতা ও মহীয়সী নারী।
শিক্ষাজীবনের দীপ্ত যাত্রা:
প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ মাদরাসায়। সেখানে মক্তব বিভাগ থেকে শরহে জামী পর্যন্ত অসাধারণ ফলাফলের মাধ্যমে পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ফযীলত, তাকমীল এবং দাওরায়ে হাদীস (স্নাতকোত্তর) সম্পন্ন করেন। তিনিই সেই সৌভাগ্যবান শিক্ষার্থী, যিনি এই তিনটি বিভাগেই বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
ইলমপিপাসু হয়ে তিনি ১৯৯৯ সালে ভারতের ঐতিহাসিক দারুল উলূম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে তিনি তাকমীল জামাতে প্রথম বিভাগে (মুমতাজ) তৃতীয় এবং ২০০০ সালে ইফতা বিভাগেও প্রথম বিভাগে (মুমতাজ) তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। এতে তাঁর ফিকহ ও ইলমের গভীরতা স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়।
শুধু তাই নয়—তিনি আধুনিক শিক্ষার প্রতিও ছিলেন মনোনিবেশী। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কামিল (ফিল হাদীস), কামিল (ফিল ফিকাহ) ও কামিল (ফিত তাফসীর) পরীক্ষায় যথাক্রমে ৫ম, ৩য় ও ২য় স্থান অর্জন করেন। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর থেকে এম.এ পরীক্ষায়ও প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করে নিজের বহুমাত্রিক একাডেমিক সক্ষমতা প্রমাণ করেন। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন ও শিক্ষাদান:
দাওরায়ে হাদীস শেষ করার পর ১৯৯৪ সালে তিনি যশোর জামিয়া ইসলামিয়ায় সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে ঢাকার তাঁতীবাজার জামিয়া ইসলামিয়াতে সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। ২০০৬ সনে জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগে সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রধান মুফতি হিসেবে যোগদান করেন, আজ অব্দি তিনি এই প্রতিষ্ঠানে ইসলামী জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন। তাঁর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে হাজার হাজার তালিবে ইলম, মুফতি ও জ্ঞান পিপাসু মানুষজন, যাঁরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে ছড়িয়ে আছেন।
তিনি উপমহাদেশের মহাপুরুষ শাইখুল আরব ওয়াল আজম সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানীর শিষ্য মুহাদ্দিসে আজিম, শায়খুল হাদিস কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. এর একান্ত স্নেহভাজন শাগরেদ এবং শায়খুল হাদিস, আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ. এর প্রিয় ছাত্র ও শাগরেদ।
অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক খেদমত:
শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। নয়াটোলা এ.ইউ.এন. কামিল মাদরাসায় তিনি হেড মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদের ইমাম ও খতিব, যেখানে তাঁর জুমার খুতবা ও বয়ান সমাজের মানুষের মাঝে দ্বীনী জ্ঞান ছড়িয়ে দিচ্ছে, এছাড়াও দেশের প্রথম সারির চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত বিভিন্ন ইসলামী অনুষ্ঠানে জীবন ঘনিষ্ঠ প্রশ্নের শরয়ী সমাধান দিয়ে থাকেন ও ইসলামী পডকাস্টে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন।
রচনাশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
মুফতি আব্দুস সালাম একজন প্রাজ্ঞ লেখকও। তিনি প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মৌলিক গ্রন্থ ও অনুবাদের মাধ্যমে ইসলামি শিক্ষাকে সহজভাবে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর রচনাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১। মহীয়সী নারীদের দিনরাত। ২।স্বামী-স্ত্রীর অধিকার। ৩।দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় দোয়া। ৪।খুতবাতুল আহকাম (অনুবাদ)। এছাড়াও হাদিস গ্রন্থ মিশকাত শরীফের অনুবাদকও তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সফলতা:
২০০৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক তাফসীর প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে ইরানের রাজধানী তেহরান যান এবং সেখানে গৌরবের সাথে ‘তৃতীয় স্থান’ অর্জন করে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেন। এ অর্জন তাঁর আন্তর্জাতিক মানের ইলম ও গভীরতা তুলে ধরে।
শাইখুল হাদীস মুফতি আব্দুস সালাম কেবল একজন আলেম নন, তিনি ইলম, আমল, খেদমত ও আদর্শিক নেতৃত্বের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি অর্জন নতুন প্রজন্মের আলেমদের জন্য দিকনির্দেশনা স্বরূপ। যাঁর কলম, যাঁর কথা, যাঁর ক্লাস—সমাজে দীনের আলো ছড়াচ্ছে নীরবে নিভৃতে গভীরে।


