একবছর আগে রক্তাক্ত জুলাইয়ের দিন কালপঞ্জি ( পর্ব ০১)

আহসান শেখ : এখন চলছে জুলাই মাস। একবছর আগে ২০২৪ সালের এই জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন রক্তাক্ত রূপ নেয় ও পরে এটি ছাত্র জনতার গণ আন্দোলনে পরিণত হয় যার ফলশ্রুতিতে ০৫ আগস্ট ২০২৪ এ সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকারের পতন হয়। ঐতিহাসিক এই বিপ্লবের বিজয়ের ধারার সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবির আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এটি পরে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আরো প্রবল হয়ে উঠেছিল যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। প্রায় ১৫০০ মানুষকে হত্যার প্রেক্ষিতে বিগত প্রায় পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশকে শাসন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এই ২০২৪ এর জুলাই এর আন্দোলন কিভাবে শুরু হয়, কীভাবে এর রক্তাক্ত রূপ নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েছিল তার ঘটনাবলী উল্লেখ করা হলো।

বিজ্ঞাপন
Advertisement

০৫ ও ০৬ জুন ২০২৪ : তৎকালীন আদালতের বিতর্কিত রায় , সরকারকে একমাসের আল্টিমেটাম : 

০৫ জুন ২০২৪ সরকারি চাকুরির নিয়োগ ব্যবস্থায় কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভের মধ্যে ২০১৮ সালে সরকার কর্তৃক জারি করা সার্কুলারকে অবৈধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। এ রায় ঘোষণার পরপরই, শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে এবং বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের জন্য ৫৬% চাকরি সংরক্ষণ করার সুবিধা দেয়ার কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ০৬ জুন ২০২৪ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে, তৎকালীন হাসিনার সরকারকে এক মাসের আল্টিমেটাম দেয় । তবে ঈদুল আজহার ছুটির কারণে বিক্ষোভ শান্ত হলেও ১ মাসের বিরতির পর তা আবার শুরু হয়।

 

০১ থেকে ০৩ জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের প্রস্তুতি : 

তখন ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ২৩ জুন ২০২৪ এ তৎকালীন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বিদায় হন বা তিনি দায়িত্ব শেষে অবসরে চলে যান এবং জেনারেল ওয়াকার উজ জামানকে নতুন সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। এই ঘটনাতেই তখন দেশের অনেক মানুষ বুঝতে পারে যে সামনের মাসগুলোতে দেশে কিছু একটা হবে। ঈদের ছুটি সহ কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর, শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের নতুন নির্বাহী আদেশের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করে। এরপর আন্দোলনকারীরা দাবি পূরণের জন্য ৪ জুলাই সময়সীমা নির্ধারণ করে।

 

০৪ ও ০৫ জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় : 

আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেনি যা কার্যত কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের সার্কুলারকে অবৈধ করেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা সারাদেশে তাদের বিক্ষোভ আরও তীব্র করে।সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রচারণা জোরদার করার জন্য, ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে এবং ৭ জুলাই (রোববার) থেকে ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের আহ্বান জানিয়ে দিনের কর্মসূচি শেষ করে। তারা এর পাশাপাশি ৬ জুলাই (শনিবার) প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এদিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান, বিক্ষোভ সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ করে।

 

০৬ থেকে ১৩ জুলাই ২০২৪ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্ম ও বাংলা ব্লকেড : 

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির প্রথম দিনে রাজধানীর শাহবাগ, নীলক্ষেত, হেয়ার রোড, মিন্টো রোড, সায়েন্স ল্যাব, বাংলামোটর মোড় এবং ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ প্রধান প্রধান সড়কগুলো কয়েক ঘন্টার জন্য অবরোধ করে রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড়ে, ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত মোড়ে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবরোধ করে।০৭ জুলাই ২০২৪ এ শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকা মহানগরী। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সারাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। ০৯ জুলাই ২০২৪ মঙ্গলবারে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশের সড়ক ও রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ভোর থেকে সন্ধ্যা অবরোধ ঘোষণা করে। এদিকে, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল করেন দুই শিক্ষার্থী। ১০ জুলাই ২০২৪ এ আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের জন্য কোটার ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন। সব গ্রেডে সরকারি নিয়োগে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনে তখন বিএনপির ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি,ইসলামী আন্দোলন এর ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র জমিয়ত, সিপিবির ছাত্র ইউনিয়ন, গণসংহতির ছাত্র ফেডারেশন ও গণঅধিকারের সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থন দেয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। পরে শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যায় ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ জানায় যে, মামলা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

১৪ জুলাই ২০২৪ স্মারকলিপি ও তুমি কে আমি কে রাজাকার স্লোগান : 

১৪ জুলাই ২০২৪ রবিবার অর্থাৎ পবিত্র আশুরার তিনদিন আগে শিক্ষার্থীরা রাজধানীতে অবস্থান বিক্ষোভ ও অবরোধসহ মিছিল বের করে এবং পরে তাদের দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে বঙ্গভবনে স্মারকলিপি পেশ করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার আগে গণভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজাকারের সন্তান বলে উল্লেখ করে বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা আন্দোলনকে আরও উসকে দেয়। হাসিনার বক্তব্যের জবাবে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় মধ্যরাতে বিক্ষোভ মিছিল করে যেখানে উচ্চশব্দে ” তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার “, ” চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার ” ইত্যাদি স্লোগান দেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মহিলা হলের ছাত্রীরা ছাত্রাবাসের গেটে কর্তৃপক্ষের লাগানো তালা ভেঙে বিক্ষোভে যোগ দেয়। সে সময় ঢাকার কিছু এলাকায় আঃলীগপন্থী লোকজন অবস্থান করলেও তারা পরে চলে যায়।

 

১৫ জুলাই ২০২৪ রক্তাক্ত আক্রমণ সংঘর্ষ নির্যাতন :

১৫ জুলাই ২০২৪ সোমবার অর্থাৎ আশুরার দুইদিন আগে (০৮ মহররম ১৪৪৬) রাজাকার স্লোগান প্রসঙ্গে আঃলীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন যে তাদের ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ‘উচিত জবাব’ দেবে। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে দুপুরের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী ছাত্রলীগের লোকজন ও তাদের পেটোয়াবাহিনী গুন্ডাপান্ডারা হামলা আগ্রাসন চালায় এবং নির্বিচারে তাদের পিটিয়ে অন্তত ৩০০ বিক্ষোভকারীকে আহত ও রক্তাক্ত করে । কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্রাবাস- ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।এদিকে, সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজশাহী শাখার হামলায় ছয় শিক্ষার্থী আহত হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ককে ফোনে পরীক্ষার করার কথা বলে ডেকে ছাত্রলীগের লোকজন তাকে লাঞ্ছিত ও মারধর করে। আন্দোলনকারীরা ১৬ জুলাই বিকাল ৩টায় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেন।

 

১৬ জুলাই ২০২৪ ব্যাপক আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগদান ও শহীদ আবু সাঈদ : 

১৬ জুলাই ২০২৪ আশুরার আগের দিন ০৯ মহররম মঙ্গলবার ভোররাতে সারা বাংলাদেশে প্রথম সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ মুক্ত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেদিন ছাত্রদের এই গণআন্দোলনে যুক্ত হতে থাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জামাতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রশিবির ও তাদের সমর্থকেরা আন্দোলনের পক্ষে ও রক্তাক্ত আক্রমণের প্রতিবাদে মতিঝিলে ব্যানার ছাড়াই বিক্ষোভ মিছিল করে। সারাদেশে সুফি বেরলভী ঘরানার দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, জাকের পার্টি ও বিশ্ব সুন্নী আন্দোলন ইনসানিয়াত বিপ্লব পার্টির ও তাদের ছাত্রসংগঠন সমূহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন এর ব্যানারে কর্মসূচি দেয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের লোকজন হামলা চালায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তুমুল সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হয়।

 

সেদিন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের মুরাদপরে ওয়াসিম ও ফয়সাল শান্ত আওয়ামী গুন্ডা পেটোয়াবাহিনীর আক্রমণে শহীদ হন পরে রাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা পাল্টা লড়াই করে ছাত্রলীগকে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দেয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ ভাংচুর করার পাশাপাশি ঢাবি ও রাবি হলের বেশির ভাগ হরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহন করে। এর প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার সরকার দেশব্যাপী স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়। তবে পরদিন গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা।

 

১৭ জুলাই ২০২৪ শহীদদের গায়েবানা জানাজা :

১৭ জুলাই ২০২৪ বুধবার সেদিন ছিল ১০ই মহররম পবিত্র আশুরা, আশুরার দিনে নবী মুসা আঃ এর নাজাত ও কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্য স্মরণীয়। সেদিন সকালের দিকে আন্দোলনকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের তাড়িয়ে দেয় এবং ক্যাম্পাসকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ ঘোষণা করে, হল ত্যাগের জন্য অনেক চাপ আসে । সেসময় বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন বেগবান করার জন্য এগিয়ে যেতে থাকে। ছাত্ররা নিহতদের জন্য ‘গায়েবানা জানাজা’ আদায় করেন। বায়তুল মোকাররম ও পল্টনেও বিএনপি সহ সমমনা দলগুলোর নেতৃবৃন্দ গায়েবানা জানাজা আদায় করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাস বন্ধ করে ছাত্রদের তাদের ছাত্রাবাস খালি করার নির্দেশ দেয়। সেসময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে অনলাইনে দেওয়া ভাষণে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের রক্তাক্ত আগ্রাসনের প্রতিবাদে এই কোটা আন্দোলনকে এক দফা অর্থাৎ আওয়ামী সরকারের পদত্যাগের আন্দোলনে রূপান্তরের আহবান জানান। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা দেয় । গ্রামীণফোন কোম্পানিসহ সকল মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানীকে তৎকালীন সরকার সকল ধরনের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

 

১৮ ও ১৯ জুলাই ২০২৪ কমপ্লিট শাটডাউন সর্বাত্মক আন্দোলন :  আশুরার পরে ১৮ ও ১৯ জুলাই ২০২৪ কমপ্লিট শাটডাউনের দিনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়,স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির প্রেক্ষিতে ঢাকায় ও অন্যান্য ৪৭টি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরিবহন বন্ধ কার্যকর করার জন্য অন্যান্য বিভিন্ন গ্রুপের সাথে যোগ দেয়। পুলিশ ও অজ্ঞাত ব্যক্তিরা বুলেট, শটগানের গুলি ও রাবার বুলেট দিয়ে তাদের উপর গুলি চালালে কমপক্ষে ২৯ জন শহীদ হওয়ার নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়। পুলিশ ও ছাত্রলীগের লোকজন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। মিরপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণ করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী এবং পুলিশ। আন্দোলনকারীদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও সাভারে আসহাবুল ইয়ামিন শহিদ হন। ১৮ জুলাই ২০২৪ বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে সরকার সারাদেশে সব ধরনের ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন করে দেয় সরকার। ১৮ জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাইতেও সারাদেশে সকল ধরনের ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখা হয়। এইদিনেও সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অবরোধ চলে। বেলা পৌনে ১টার দিকে আন্দোলনকারীরা কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানা ঘেরাও করলে থানার ভেতর থেকে পুলিশ সদস্যরা ছররা গুলি ছুঁড়েন, এতে শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ঢাকার উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা পল্টনসহ কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সারাদিন দফায় দফায় সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মিরপুরে জুমার নামাজের পর বেলা তিনটার দিকে কাজীপাড়া, শ্যাওড়াপাড়া এবং মিরপুর – ১০-এর বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। সাভারে বিকাল তিনটা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে হাজারো শিক্ষার্থী জড়ো হয়।বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্র অনুযায়ী ১৯ জুলাই শুক্রবার সারাদেশে কমপক্ষে ৫৬-৬৬ জনের মৃত্যু হয়। ১৯ জুলাই তৎকালীন সরকার মধ্যরাতে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেয়।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img