যথাযোগ্য মর্যাদায় পাকিস্তান ও ভারতের ৭৮ তম স্বাধীনতা দিবস পালিত

গত ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতের ৭৮ তম স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়েছে। শতবছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম শেষে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্টে উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীনতা রাষ্ট্রের জন্ম হয় ও ব্রিটিশদের বিদায় হয়, তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমানে বাংলাদেশ) পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা স্বাধীন দেশ হয় । এ বছর (২০২৫) দুই দেশের স্বাধীনতার ৭৮ বছর পূর্ণ হয়েছিল। এ বার দুই দেশের স্বাধীনতা দিবস ভিন্ন বিশেষ আঙ্গিকে পালিত হয়েছিল কারণ কয়েকমাস আগে গত মে ২০২৫ এ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধ সংঘর্ষ হয় যা ১১ মে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সমাপ্ত হয় ,পাকিস্তান এ যুদ্ধে নিজেকে বিজয়ী দাবী করে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement

 

এবছর পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৪ আগস্টে মারকা এ হাক্ব ( সত্যের যুদ্ধ) এর বিজয়ের আবহে জাকজমকপূর্ণ ভাবে স্বাধীনতা দিবস পালন করে। এ উপলক্ষে ১৪ আগস্টের কয়েকদিন আগেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এবং প্রাদেশিক শহরগুলোতে ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের রাস্তায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আলোকসজ্জা করা হয়, প্রতিটি জায়গায় জায়গায় গ্রামে গঞ্জে পাকিস্তানের সবুজ সাদা চাঁদ তারা বিশিষ্ট পতাকা উড্ডীন হয়,জনগণ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করে । পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আগের দিন বুধবার ১৩ আগস্ট স্থানীয় সময় রাত ০৯ টায় রাজধানী ইসলামাবাদের জিন্নাহ স্টেডিয়ামে প্রধান কেন্দ্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বিশেষত জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন শুরু হয় যেখানে সেদেশের সশস্ত্র বাহিনীর এক ঘন্টার মিলিটারি প্যারেড কুচকাওয়াজ, বড় পর্দায় পাকিস্তানের ৭৮ বছর নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের পুরস্কার বিতরণ, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্থানীয় সময় মধ্যরাত ১২ টায় ১৪ আগস্টের প্রথম প্রহরে আকাশে বর্ণিল আতশবাজি ফোটানো অনুষ্ঠিত হয়। সেই জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপ–প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সহ সরকারের মন্ত্রীগণ, সেদেশের প্রধান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনির সহ সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গণ, পাকিস্তানের সংসদের নিম্নকক্ষ এবং উচ্চ-কক্ষ বা সিনেটের স্পিকারসহ হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সামরিক কুচকাওয়াজে আমন্ত্রিত তুরস্ক ও আজারবাইনের একদল সেনাসদস্যরাও অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তার বক্তব্যে দেশের সামরিক সক্ষমতা আরো বাড়াতে সেনাবাহিনীর রকেট ফোর্স কমান্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এই বাহিনী শত্রুকে ‘সব দিক থেকে’ আঘাত হানতে সক্ষম।

তিনি এই ফোর্স গঠনকে দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলেও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলকে ‘চার্টার অব স্ট্যাবিলিটি বা মিসাক্ব এ ইসতিহকামে পাকিস্তান চার্টার ’তে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, যা তাঁর মতে শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক একটি কাঠামো।

 

ইসলামাবাদের পাশাপাশি পাকিস্তানের লাহোর ও করাচী সহ প্রাদেশিক শহরগুলোতেও প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে ১৩ আগস্ট রাতে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আতশবাজির আয়োজন হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বানী দেন। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের দিন ১৪ আগস্ট ভোরে ফজরের নামাজের পরে বিশেষ দোয়া মোনাজাত হয় এবং সূর্যোদয়ের পরে রাজধানী ইসলামাবাদে ৩১ বার তোপধ্বনি ও প্রাদেশিক শহরগুলোতে ২১ বার তোপধ্বনি হয়।

 

পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রধান কর্মসূচীর অংশ হিসেবে সকালে কেন্দ্রীয় রাজধানী ইসলামাবাদে , প্রাদেশিক শহরগুলো (লাহোর, সিন্ধ প্রদেশের করাচী, বেলুচিস্তানের কোয়েটা, খাইবার পাখতুনখোয়ার পেশোয়ার ও গিলগিট বালটিস্তানের স্কারডু ও এই প্রদেশগুলোর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে) সহ জেলায় জেলায় এবং পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাজধানী ইসলামাবাদের পাকিস্তান মনুমেন্ট ইয়াদগার এ শোহাদা স্মৃতিস্তম্ভে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ও যারা পাকিস্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেসময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল কর্তৃক মিলিটারি ব্যান্ড পার্টি বা বাদক দলের বিউগলের করুন সুর ও জাতীয় সংগীত এর বাজনা সহ বিশেষ গার্ড অব অনার প্রদান করে ও পরে জিন্নাহ কনভেনশন সেন্টারে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় । করাচীতে মাজারে কায়েদ যেখানে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা,স্বাধীন পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সমাধিতে এবং লাহোরে সেদেশের জাতীয় কবি ও পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা ইকবালের সমাধিতে ” চেঞ্জিং অফ গার্ডস ” বা সেদেশের সামরিক বাহিনীর নতুন ইউনিট সমাধির নিরাপত্তা ও পাহারার দায়িত্ব পূর্ববর্তী ইউনিটের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। এবার করাচীতে জিন্নাহর সমাধিতে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর নতুন একটি ইউনিট এবং লাহোরে ইকবালের সমাধিতে সেনাবাহিনীর একটা নতুন ইউনিট গার্ডের দায়িত্বভার গ্রহণ করে ও সেসব গার্ডের সদস্যরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। করাচীতে জিন্নাহর সমাধিতে সিন্ধ প্রদেশের গভর্নর কামরান তিসৌরি ও মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহ শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ ও দোয়ায় অংশগ্রহণ করেন। পাঞ্জাব,বেলুচিস্তান, সিন্ধ ও গিলগিট বালটিস্তানের গভর্নর ও মুখ্যমন্ত্রীগণ এবং আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ার উল হককে তাদের নিজ নিজ প্রাদেশিক সরকারি বাসভবনে বিশেষ গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। প্রাদেশিক সরকারগুলোর উদ্যোগে বিশেষ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনতা দিবস এর দিন বিভিন্ন দল সংগঠন ও সাধারণ জনগণ কর্তৃক র‍্যালী মিছিল শোভাযাত্রা আয়োজন করে। পাকিস্তানের পাশাপাশি প্রবাসেও বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানিরা তাদের স্বাধীনতা দিবস পালন করে ও পাকিস্তান দূতাবাসগুলোতে পতাকা উত্তোলন,আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়।

 

ভারতে ১৫ আগস্ট শুক্রবার সেদেশের স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সহ প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও সরকারি বেসরকারি ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয় ও প্রতিটি এলাকায় এলাকায় ভারতের জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। ভারতের স্বাধীনতা দিবসের দিন গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে সকালে রাজধানী দিল্লীর লাল কেল্লায় আনুষ্ঠানিকতা হয় যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত ছিলেন, ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয় ও প্রধানমন্ত্রী মোদী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্যে গত এপ্রিলের পহলগামের ঘটনা এবং পাক ভারত যুদ্ধে ভারতের অপারেশন সিন্দুরের প্রসঙ্গ উঠে আসে। দিল্লীর পাশাপাশি অন্যান্য রাজ্যেও পতাকা উত্তোলন,কুচকাওয়াজ এর আনুষ্ঠানিকতা হয় ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীগণ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তবে ভারত অধিকৃত জম্মু কাশ্মীরে ব্যাপক বৃষ্টি ও বন্যার কারণে স্বাধীনতা দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা হয়।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img