এবার ১৫ই আগস্ট ছিল শুক্রবার। গেল এই দিনটিতে রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশেই বলা যায় প্রায় একরকম শান্ত নীরব থাকলেও দুয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছিল। অতীতে ১/১১ সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন-মঈন এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরে আঃলীগ সরকারের আমলে (অর্থাৎ ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত) ১৫ আগস্টে শেখ মুজিবের মৃত্যুর স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালিত হতো,আঃলীগপন্থীদের বাইরেও কিছু সেকুলার লিবারেল লোকজন তার ১৫ আগস্টে শেখ মুজিবকে স্মরণ করে। আবার অপরদিকে বাংলাদেশের ফ্রিডম পার্টি এবং পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেনের অনুসারী সহ অনেকেই ১৫ আগস্টকে নাজাত দিবস কিংবা বাকশাল থেকে মহা মুক্তির দিন হিসেবে পালন করে থাকেন। গতবছর ২০২৪ এর ০৫ আগস্টে হাসিনার সরকারের পতনের পরে ১৫ই আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিল করা হলেও সেসময় ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জ ও মাগুরা সহ কিছু জেলায় আঃলীগ পন্থী ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত লোকেরা সীমিত আকারে ১৫ আগস্টে শেখ মুজিবের জন্য শোক দিবস পালন করে। তবে গতবছর ১৫ আগস্টে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ ও শাহবাগ সহ আশপাশের এলাকায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে আঃলীগ এর নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশ হয়েছিল সেখানে ব্যাপক নাচ গান হয়েছিল। গতবছরের মতো এবারও ১৫ আগস্টে কোনো সরকারি ছুটি ছিল না।
তবে এবারের ১৫ আগস্ট ছিল ভিন্ন। ধানমন্ডি ৩২ কে পুলিশের নিরাপত্তার চাঁদরে ঢেকে দেওয়া হয়। আগের দিন ১৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় কিছু লোকজন এবং বিএনপি সহ সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মী সমর্থকরা ধানমন্ডি ৩২ এর আশপাশে অবস্থান করে এবং পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ফাঁসি চেয়ে দফায় দফায় মিছিল করেছেন । বৃহস্পতিবার রাতেই সেখানে ট্রাকে করে বড় স্পিকার বা সাউন্ডবক্স ডেক্সেট আনা হয়। ট্রাকে বসানো হয় বড় পর্দা। কিছু সময় পরপর সেখানে দেখানো হয় ‘জুলাই গণহত্যার’ প্রামাণ্যচিত্র। পরে মিউজিকযুক্ত গান বাজিয়ে নাচানাচিও করেন কিছু মানুষ। মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির কিছু হলে লোকজন ডিজে ডেক্সেটে গান বাজিয়ে নাচানাচি ও আনন্দ উচ্ছাস করেন । ১৫ আগস্ট শুক্রবার সকাল থেকেই ৩২ নম্বরে সাধারণ মানুষের ঢোকা বন্ধ করে দেয় পুলিশ। দিনের বেলায় সেই রাতে এনে রাখা সেই ট্রাকেই বাজানো হয় মেজর শরীফুল হক ডালিমের ভাষণ। ভাষণের সময় স্ক্রিনে মেজর ডালিমের ছবি ভাসছিল আর লেখা ছিল, ‘মেজর ডালিমের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ’।
দিনটিকে ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করছেন বলে মন্তব্য করেন ‘পিপলস অ্যাক্টিভিস্ট কোয়ালিশন’ (প্যাক) নামক একটি সংগঠনের সদস্যরা। তারা সেখানে বাতাসা মিষ্টি বিতরণ করেন, পুলিশ সদস্যদেরও বাতাসা খেতে আমন্ত্রণ জানান। তবে পুলিশ সদস্যরা সেই বাতাসা নেননি। তার আগে তারা পুলিশের ঘেরাটোপে থেকে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্যেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মারধর ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন কয়েকজন। সেদিন সকালে ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা এক রিকশাচালকও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পুলিশের উপস্থিতিতেই স্থানীয় লোকজন স্লোগান দিয়ে কয়েকজন তাকে মারধর করেন।বেলা ১১টার দিকে ওই ব্যক্তি রিকশা চালিয়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ৩২ নম্বরে আসেন। ফুলের তোড়ার ওপর কাগজে লেখা ছিল ‘১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস’। তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ৩২ নম্বরে জড়ো হওয়া কিছু মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন। একজন লাফ দিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে ফুলের তোড়া কেড়ে নেন। চলে মারধর; ভাঙচুর করা হয় তার রিকশাও। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই রিকশাচালক।
এর আগে আওয়ামী লীগের কর্মী সন্দেহে এক নারীকেও হেনস্তা করা হয়। পরে পুলিশের মাধ্যমে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে এসে দুপুরে ধানমন্ডি থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের নির্দেশনায় তারা এসব করছেন। ওসি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন, কিছুদিন আগে আমাদের যে প্রেস সচিব, তিনি কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করব।”ব৩২ নম্বরে নাশকতার পরিকল্পনার কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই জানিয়ে ওসি বলেন, “সরকারিভাবে যেহেতু তাদের (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আমরা সেই নির্দেশনা ফলো করব।” সন্ধ্যার পরেও সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোকজন ডেক্সেটে গান বাজিয়ে নাচানাচি করে।
এদিকে ঢাকার বাইরেও কিছুটা নীরব পরিস্থিতি ছিল ১৫ আগস্টে। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া যেখানে শেখ মুজিবের কবর আছে সেখানে আঃলীগ এর কেউই ঢুকে নি, টুঙ্গিপাড়া খালি ছিল।


