দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর ছবি সরিয়ে ফেলা : কোন সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে ??

সম্প্রতি গত ১৬ আগস্ট বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেট অফিস থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ছবি সরানোর নির্দেশনা দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই নির্দেশনা পাওয়ার পর এরই মধ্যে কয়েকটি দেশের বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement

 

তবে, কেন বা কী কারণে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর এই নির্দেশনা, তা নিয়ে স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারেনি।জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে হঠাৎ রাষ্ট্রপতির ছবি নামানোর এই নির্দেশের কারণ কী তা সরকারের তরফে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি নামানো হয়। তবে এই ব্যাপারে কোনো লিখিত নির্দেশনা জারি করেনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। ছবি সরানোর বিষয়ে একজন উপদেষ্টার আগ্রহের বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। তবে তিনি তা অস্বীকার করেছেন।

 

এদিকে মৌখিক নির্দেশনা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। নানা রকমের গুজবও ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে বিধিবিধান উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন জারি হলে অনেক অস্পষ্টতা ও বিতর্ক এড়ানো যেত।

 

এদিকে রাষ্ট্রপ্রধানের ছবি সরিয়ে ফেলতে হবে এমন কোনো লিখিত নির্দেশনা কোনো দপ্তর কিংবা মিশনকে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার। রোববার রাতে সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, সরকারি দপ্তরে পোট্রেট ব্যবহার শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার নিরুৎসাহিত করছে। অলিখিতভাবে জিরো পোট্রেট নীতি বজায় রেখেছে। তারপরও কেউ কেউ সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের ছবি নিজ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করেছে। সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে এমন কোনো লিখিত নির্দেশনা কোনো দপ্তর কিংবা মিশনকে দেওয়া হয়নি। তারপরও দেখা যাচ্ছে আজ এটা নিয়ে বাজার গরম করে ফেলা হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার পর রাজনীতি নিয়ে ঘোঁট পাকানোর সুযোগ কমে আসছে। কাটতি ধরে রাখার জন্য ছোটখাটো অনেক বিষয়কেও এখন তাই পাহাড়সম করে তোলা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা তার ছবি সঙ্গে পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিদেশে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি মিশনে টানিয়ে রাখা হয়েছিলো। এসব মিশনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কোনো ছবি নেই। রাষ্ট্রাচার অনুসারে সেটি থাকার কথাও নয়। তথাপি বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে তার ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে মর্মে প্রচারণা চলছে। পররাষ্ট্র দফতর সূত্র বলছে, টেলিফোনের নির্দেশনায় কোন প্রেসিডেন্টের ছবি সরাতে হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। যদিও এই ‘প্রেসিডেন্ট’ বলতে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির কথা বলা হয়। গত শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কয়েকটি মিশনে টেলিফোনে এই নির্দেশ দেয়া হয় বলে জানা যায়। গতকাল রোববার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, আসলে এ খবরটি সঠিক নয়। সরকারিভাবে কোনো সময় প্রেসিডেন্টের ছবি টানানো ছিল না। এখনো নেই। মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত কয়েকজন রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারকে ফোন করেন। ঢাকা থেকে বিদেশে বাংলাদেশের নির্ধারিত কয়েকজন কূটনীতিককে নিজেদের মিশন থেকে যেকোনো ছবি সরিয়ে নিতে ফোনে নির্দেশনা দেয়া হয়। অন্য মিশন, উপমিশন থেকে ছবি সরানোর জন্য অন্যদের জানাতেও নির্দেশনা দেয়া হয়। অথচ কোন কর্মকর্তা ফোনকলটি করেছে তার নাম-পরিচয় কিছুই প্রকাশ করা হচ্ছে না। যা আরো রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

 

 

 

এদিকে প্রেসিডেন্টের ছবি নামিয়ে ফেলার গুজবের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় প্রেসিডেন্টের দফতর বঙ্গভবনে। সেখানকার সূত্রগুলো জানায়, বিদেশে অবস্থিত কোনো দূতাবাস থেকে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলার কোনো দালিলিক তথ্য প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে নেই। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের সচিব খান মোহাম্মদ নূরুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাতে তার কোনো বক্তব্য মেলেনি। প্রসঙ্গ, জুলাই-অভ্যুত্থানের পর নানা সময়ে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সরানোর চেষ্টা করা হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বিদ্যমান সংবিধানে প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ও রাষ্ট্রের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এ ছাড়া তিনি প্রধান বিচারপতি এবং অন্য বিচারপতিদের নিয়োগ দেন। যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যত প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা খুব একটা না থাকলেও সরকারের দৈনন্দিন কার্যপরিচালনায় সহযোগিতা করেন তিনি। প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। যেমন জরুরি অবস্থা ঘোষণা, সংসদ স্থগিত করা, যুদ্ধ ঘোষণা প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারভুক্ত। সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যা দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও পদোন্নতি দেন তিনি। প্রয়োজনে অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শনেরও ক্ষমতা রাখেন।

 

আইনজ্ঞদের মতে, সাংবিধানিক এ পদ থেকে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সরানো হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। বিদ্যমান সংবিধান অনুসারে সেই পদ পূরণের আপাত কোনো সুযোগ নেই। কারণ সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। এ বাস্তবতা সত্ত্বেও ক’দিন পর পর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে সরানোর ধুয়া তোলা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, যা সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠীর পরিচালিত সুপরিকল্পিত প্রপাগান্ডা। বাংলাদেশে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুবিধা হয় স্বার্থান্বেষী মহলের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি করা গেলে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এমন দুরভিসন্ধি থেকে ক’দিন পরপরই বাজারে ছাড়া হচ্ছে ‘সাহাবুদ্দিন-মাইনাস’ গুজব। আইনজ্ঞরা মনে করেন, সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলার কথিত যে টেলিফোন নির্দেশনা দেয়া হয়েছেÑ মর্মে প্রচারিত হচ্ছে এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় রহস্যজনকভাবে নীরব। এ প্রপাগান্ডার বিপরীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় কোনো ব্যাখ্যা-বিবৃতি অদ্যাবধি দেয়া হয়নি। ফলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করে নির্বাচন পেছানোসহ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ওঁৎপেতে থাকা সরকারের উচ্চভিলাষী একটি অংশের ইন্ধন রয়েছে মর্মে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Related articles

spot_img

Recent articles

spot_img