দীর্ঘ ১৩ বছর পরে সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন পাকিস্তানের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাকিস্তানের বর্তমান উপ–প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্প্রতি গত ২৩ আগস্ট শনিবার তিনদিনের বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং প্রথম দিন বাংলাদেশ সময় দুপুরে তিনি বিশেষ ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। ঢাকায় সরকারি সূত্র জানিয়েছে, এবারের সফরে দুদেশের মধ্যে কূটনীতিক ও সরকারি পাসপোর্টে বিনা ভিসায় যাতায়াতের বিষয়ে চুক্তি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিষয়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, দুই দেশের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা, ফরেন সার্ভিস একাডেমি ও কৌশলগত বিষয়ে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। এ সফরে প্রধান উপদেষ্টা ড ইউনুস ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা সাক্ষাৎ এর কথাও রয়েছে।
এ ছাড়া সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বিষয়ে আগে সই হওয়া একটি চুক্তি নবায়ন করা হবে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, স্বাধীনতা-পূর্ব অভিন্ন সম্পদে বাংলাদেশের অংশ হস্তান্তর ও আটকেপড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় আসবে।
গতকাল রাওয়ালপিন্ডির নূর খান বিমানঘাঁটি থেকে ইসহাক দারের বিদায়ের সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তিনি ‘বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সফর’ শুরু করেছেন। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকায় তিনি বাংলাদেশি নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন। এর আগে সবশেষ আওয়ামী আমলে ২০১২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পিপলস পার্টি পিপিপির হিনা রাব্বানী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তারপরে ১৩ বছরে পাকিস্তানের আর কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেন নি।
ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফরের প্রথম দিন শনিবার ঢাকায় ব্যস্ত সময় পার করেন। তিনি সেদিন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে পাকিস্তান হাইকমিশনে প্রথমে এনসিপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এরপর জামায়াতে ইসলামী এবং সন্ধ্যায় বিএনপির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসহাক দার।
বিএনপি ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে তার বাসভবনে যাবেন বাংলাদেশ সফররত পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। রোববার (২৪ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের বাসভবনে তার যাওয়ার কথা ছিল।
প্রথমে ইসহাক দারের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ওই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠক শেষে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘বৈঠকে বাংলাদেশের জনগণের চিন্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আগে যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক ছিল সেখান থেকে উন্নতির সুযোগ আছে। এ সময় একাত্তরের ইস্যু অবশ্যই ডিল করা উচিত। বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে জানিয়ে আখতার হোসেন বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ যেসব বিষয় উন্নয়ন করা যায়, সে বিষয়ে কথা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বের, কোনো আধিপত্য থাকবে না। পরে জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসহাক দার। বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব দেন দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। বৈঠক শেষে তাহের সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের সঙ্গে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক এবং বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সার্ককে সক্রিয় করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে তাহের আরও বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল একপেশে। আমরা মনে করি, সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক থাকা দরকার। সেটার ব্যাপারে বৈঠকে দুই পক্ষের তরফেই জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বৃদ্ধির দিকে জোর দিয়ে আমরা বলেছি- আজকে সারা বিশ্বে যেসব সমস্যা হচ্ছে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনের সমস্যা এসব বিষয়ে যেন মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয়, সেই আলোচনাও আমরা করেছি।
২০১২ সালের পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটিই প্রথম বাংলাদেশ সফর। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সফর সামনে রেখে গত ১৬-১৭ এপ্রিল ঢাকা সফর করেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ। সে সময় দুদেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের ২৭-২৮ এপ্রিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের কথা ছিল। তবে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করা হয়।
২০১২ সালে সর্বশেষ পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন হিনা রব্বানি খার। ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে ওই সময় ঢাকা সফর করেছিলেন তিনি।গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে স্বৈরাচারী হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেশ কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির অনুমতি দিয়ে পাকিস্তানি পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাও তুলে নিয়েছে এবং সমুদ্রপথে দুই দেশ সরাসরি বাণিজ্যও শুরু করেছে।


