যে কারণে আওয়ামী লীগের নেতানেত্রী এবং কর্মীরা জুলাই গণহত্যার জন্য কোন প্রকার অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশ করে না
লিখেছেন – ডাঃ জুনায়েদ আল আযদী
অনেকেই দেখি এই বিষয়টাতে অবাক হন বা বিস্ময় প্রকাশ করেন যে একটা দলের মানুষ কীভাবে এমন হয়! নিজ দলের লোকজন এইরকম ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার সাথে মানুষ মারলো, কিন্তু সেই দলের কাউকে কখনো একটু অনুতপ্ত হতে দেখা গেলো না, বরং সুযোগ পেলে আবারও হত্যাযজ্ঞ চালাবে বলে ক’দিন পর পর বলে বেড়াচ্ছে! ওদের নেতারা নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে আবারও কোনোভাবে ক্ষমতায় ঘেঁষতে ব্যস্ত, তাদের নির্দেশে নিজের দেশের এতো মানুষকে গুলি করে মারলো, পুড়িয়ে, পিটিয়ে মেরে ফেললো, অথচ ওদের বিন্দুমাত্র লজ্জা কেন নেই, এই ভেবে অনেকেই হতাশ বোধ করেন! কিন্তু এর পেছনে একটা বিজ্ঞানসম্মত এবং যুক্তিযুক্ত ব্যাপার আছে যা জানলে আপনি আর অবাক হবেন না।
গবেষণা আমাদেরকে জানায় যে, একটি জনসংখ্যার কিছু অংশ মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যা তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। ভেঙে বলছি। এক ধরনের মানুষ রয়েছে যাদের মধ্যে সহমর্মিতা বিষয়টা থাকে না, অর্থাৎ অন্য কারুর কষ্টে এরা কোনরকম কষ্ট বোধ করে না, ইচ্ছা করে যে এমন করে তা নয়, এদের মধ্যে অন্যের কষ্ট দেখে কষ্ট পাওয়ার অনুভূতিটাই কাজ করে না। এরা নিজেদের কোন অন্যায় কাজের জন্য কোন ধরনের অনুশোচনা বোধ করে না। এছাড়া এরা খুব সহজেই নিজের স্বার্থে মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আত্নকেন্দ্রী হয়ে থাকে, মানে নিজেদেরকে অন্যদের থেকে সেরা মনে করে। এদের মধ্যে অনেকেই খুব ভালোভাবে অন্যকে ম্যানিপুলেট করতে পারে, এই বৈশিষ্ট্যের যাদের ন্যাচারাল চার্ম থাকে, ম্যানিপুলেট তাদের জন্য আরও সহজ হয়ে যায়, এছাড়াও এদের কারো কারো মধ্যে আবেগতাড়িত আচরণ ও দায়িত্বহীনতা দেখতে পাওয়া খুব স্বাভাবিক (১)। মনোবিজ্ঞানে এই সব বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার কারণ হিসেবে ব্যক্তিত্বের বিকৃতিকে দায়ী করা হয়েছে। ব্যক্তিত্বের এই বিকৃতি আসলে যে কোন জনপদে কিছু মানুষের থাকবেই। মনোবিজ্ঞানে এদেরকে বলা হয় ‘সাইকোপ্যাথ’। জ্বি, অনেকেই হয়তো এই শব্দটি শুনেছে, অনেকেই এটিকে হয়তো শুধু গালি হিসেবে জানে, অনেকে মুভি-নাটকে বিভিন্ন চরিত্রে দেখেছে (বাস্তবে সেভাবে সাইকোপ্যাথরা খুন করে বেড়ায় না, বরং স্বাভাবিক মানুষদের সাথে স্বাভাবিকভাবে মিশে থাকে)। তবে যত মানুষ এই শব্দটার সাথে পরিচিত, আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে সিংহভাগ মানুষ যা জানে না, তা হল – একটা জনপদে সাইকোপ্যাথ মানুষদের সংখ্যা আসলে কেমন।
এর উত্তরেই আছে গণহত্যায় আওয়ামী লীগের কোন অনুশোচনা না থাকার, তার চেয়ে বরং উল্লসিত হওয়ার পেছনের কারণ।
সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে একটি জনপদে শতকরা সাড়ে চার ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সাইকোপ্যাথ হতে পারে (২)। এটি একটি মেটা এনালাইসিস ছিল, তাই এই সংখ্যাটি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য। এখন বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা শেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১২ কোটি (যদিও এটা সন্দেহপূর্ণ, আরও বেশি হতে পারে), সেই হিসেবে সাইকোপ্যাথদের সংখ্যা এর ৪.৫% হলে তা কমপক্ষে প্রায় ৫৫ লাখ। আমার ধারণা এদের মধ্যে বেশিরভাগই গত ষোলো বছরে আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী হয়েছে, সাইকোপ্যাথদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেটাই হবার কথা। এটা স্পষ্ট ছিল যে পতিত সরকারের অনুগত হলেই নিজের স্বার্থে বিভিন্ন অন্যায় কাজ করতে পারা যেত, কোন রকম অপরাধবোধ দেখাতে হতো না, একই সাথে খ্যাতি আর যশ পাওয়া যেতো, এইসব একজন সাইকোপ্যাথের জন্য লোভনীয় বিষয়। তার আগে থেকেও অবশ্য লীগে এমন মানুষজন বেশ পরিমাণে ছিল। যারা ওদের সাথে ক্লোজলি মিশেছে, তারা মিলিয়ে দেখতে পারে। একটা কথা লিখতে ভুলে গেছি, সাইকোপ্যাথদের বেশিরভাগের (৮২%) মধ্যে স্যাডিজম থাকে (৩)। স্যাডিজম হল অন্যের কষ্ট দেখে মজা পাওয়ার বা স্যাটিসফাইড হওয়ার বিকৃত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। উদাহরণ হিসেবে তো চাক্ষুষ দেখা গেছে যে জুলাইয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় রাস্তায় খুন করা হয়েছে। তারপরে সেটার প্রতিক্রিয়ায় লীগের লোকজন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় যেই রকম উদাসীনতা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় যেই রকম উল্লাস প্রকাশ করেছে, সেটা তো অনেকেই দেখেছেন, তাই না? এইবার মিলিয়ে নিন, কেন নিজেদের ঐতিহাসিক পতনের পরেও এদের মধ্যে কোন অনুতাপ দেখা যায় না, অনুশোচনা দূরের কথা, কেন বিনা দোষে নির্মমভাবে খুন হওয়া শত, হাজারো মানুষগুলোর জন্য কোন রকম কষ্ট প্রকাশ করতে পর্যন্ত দেখা যায় নি। এরা নিজেরাও জানে না যে এরা কী রকম বিকৃত চরিত্রের মানুষ, বরং নিজেদের সেই বৈশিষ্ট্যগত আত্নকেন্দ্রীকতা ও ম্যানিপুলেটিভ নেচার থেকে এরা নিজেদের যে কোন কাজের পেছনে একটা যুক্তি দাঁড় করে নেয়, যা তাদের নিজেদেরকে এবং তাদের মত অন্য যেসব সাইকোপ্যাথ আছে, কেবল তাদেরকেই স্যাটিসফাই করে।
তাই, অনেকে যেটা মনে করে সেটা আসলে ভুল, লীগ করার কারণে কেউ সাইকোপ্যাথ হয় নি, বরং সাইকোপ্যাথরাই বেশিরভাগ আওয়ামী লীগ করে এসেছে, আওয়ামী লীগে তাদেরকে জায়গা করে দিয়ে নিজের বিকৃতি চর্চা করার সকল সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ফলাফল সবার সামনে আসছে, আরও আসবে। তবে এরপরের সমস্যার কথা হচ্ছে, সাইকোপ্যাথদের সন্তানরা-ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাইকোপ্যাথ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (৪)। তাই, এই কাহিনী যে চলতেই থাকবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বর্তমানে বা ভবিষ্যতে যে বা যারাই সমাজে মিশে থাকা সাইকোপ্যাথদের জায়গা করে দিবে, সুযোগ সুবিধা দিবে, সেখানেই তারা নিজের ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নানান অন্যায় আর ভয়ংকর কাজ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। আপনার অবাক হওয়া বা না হওয়ায় বাস্তবতা বদলে যাবে না।
প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্রঃ
১) https://g.co/gemini/share/bac99fdc74a1
২) https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC8374040/
৩) https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/14593792/
৪) https://consensus.app/results/?q=Is%20psychopathy%20genetic%3F&pro=on


